রসগোল্লা কার, বাংলা না ওড়িশার? শেফ কুণাল কাপুরের মন্তব্যে ফের শুরু ‘মিষ্টি যুদ্ধ’ – এবেলা

রসগোল্লা কার, বাংলা না ওড়িশার? শেফ কুণাল কাপুরের মন্তব্যে ফের শুরু ‘মিষ্টি যুদ্ধ’ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

বাঙালির প্রাণের আবেগ রসগোল্লার উৎস নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে এক তীব্র বিতর্ক। আর এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সেলিব্রিটি শেফ কুণাল কাপুর। সম্প্রতি ‘মির্চি পাঞ্জাবি’র একটি পডকাস্টে ভারতীয় খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করার সময় তিনি রসগোল্লার উৎপত্তি নিয়ে একটি মন্তব্য করেন। কুণাল কাপুর বলেন, “কলকাতার মানুষ হয়তো আমার ওপর একটু রুষ্ট হতে পারেন, তবে শোনা যায় রসগোল্লা আসলে ওড়িশার।” শেফের এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দুই রাজ্যের ভোজনরসিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরোনো বিতর্কটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

অবশ্য কুণাল কাপুর ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ‘ছানাপোড়া’র প্রশংসা করে সেটিকে ভারতের প্রাচীন ‘চিজকেক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, বাংলা ও ওড়িশা—উভয় রাজ্যেরই মিষ্টি তৈরির কারুকাজ এবং ছানার ব্যবহারের ধরণ অত্যন্ত কাছাকাছি। তবে তাঁর এই ঐতিহাসিক দাবির পক্ষে করা মন্তব্যটি বাঙালি নেটিজেনদের একাংশ সহজভাবে নিতে পারেননি।

জিআই ট্যাগ এবং ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপট

রসগোল্লার ভৌগোলিক অধিকার বা জিআই (Geographical Indication) ট্যাগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশার আইনি লড়াই বেশ দীর্ঘ। ২০১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘বাংলার রসগোল্লা’র জন্য প্রথম জিআই ট্যাগ লাভ করে, যা তৎকালীন সময়ে বাংলার বড় জয় হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে এই লড়াইয়ের এখানেই শেষ হয়নি। ২০১৯ সালে ওড়িশা সরকারও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ‘ওড়িশা রসাগোলা’র জন্য পৃথক জিআই ট্যাগ হাসিল করে নেয়। ফলে আইনি পরিভাষায় দুই রাজ্যের রসগোল্লাই নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে স্বীকৃতি পায়।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ওড়িশার দাবি অনুযায়ী পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রীতির সঙ্গে রসগোল্লা বহু শতাব্দী ধরে যুক্ত। মন্দিরের ‘নীলাদ্রি বিজে’ উৎসবের সময় মা লক্ষ্মীকে রসগোল্লা নিবেদন করার প্রাচীন প্রথা রয়েছে, যার উল্লেখ পঞ্চদশ শতাব্দীর ওড়িয়া রামায়ণেও পাওয়া যায়। অন্যদিকে, বাংলার দাবি হলো আধুনিক স্পঞ্জ রসগোল্লার জনক বাগবাজারের বিখ্যাত ময়রা নবীনচন্দ্র দাস। ১৮৬৮ সালে তাঁর হাত ধরেই তৈরি হয় ধবধবে সাদা ও রসালো স্পঞ্জ রসগোল্লা, যা ওড়িশার কিছুটা শক্ত ও হালকা বাদামী রঙের ক্যারামেল স্বাদের রসগোল্লা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

বিতর্কের কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

এই ধরণের সেলিব্রিটি মন্তব্য বা বিতর্ক বারবার ফিরে আসার মূল कारण হলো দুই অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক আবেগ এবং নিজেদের রন্ধনশৈলীকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের তাগিদ। কুণাল কাপুরের মতো একজন প্রভাবশালী শেফের মন্তব্য এই আঞ্চলিক রেষারেষিকে সাময়িকভাবে তীব্র করলেও, এর একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এই বিতর্কের ফলে ভারতীয় মিষ্টি শিল্পের প্রাচীন ইতিহাস ও রন্ধন সংস্কৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনা আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে বাংলা ও ওড়িশা, দুই রাজ্যেরই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির বাজার ও পর্যটনে ভোজনরসিকদের আগ্রহ নতুন করে তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত ভারতের সমৃদ্ধ খাদ্য সংস্কৃতির প্রচারেই সাহায্য করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *