রোদ থেকে ফিরেই এসি ঘরে ঢোকার অভ্যাস, ফুসফুসে থার্মাল শকের মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন চিকিৎসক – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
বাইরে মাথার ওপর গনগনে রোদ এবং পারদ চল্লিশের ঘর ছুঁই ছুঁই। এই তীব্র গরম থেকে অফিস বা বাড়ি ফিরে সোজা এসি চালিয়ে তার সামনে বসে পড়া কিংবা মেট্রো ও শপিং মলের কনকনে ঠান্ডা আবহে ঢুকে পড়া অনেকেরই চেনা অভ্যাস। কিন্তু এই সাময়িক আরাম যে ফুসফুস ও শ্বাসনালীর ওপর কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, সেই বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত কম। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই আকস্মিক তাপমাত্রার পরিবর্তনজনিত ধকলকে ‘থার্মাল শক’ বলা হয়। রোদ থেকে হঠাৎ এসির ঠান্ডায় ঢুকলে শ্বাসনালীর ভেতরে এক বিধ্বংসী পরিবর্তন ঘটে বলে সতর্ক করেছেন উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্লাষ্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডঃ সৌম্য গায়েন।
শরীরের স্বাভাবিক সুরক্ষাকবচ ভেঙে পড়ার কারণ
মানুষের শরীরে বাতাস প্রবেশের একটি স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় মাত্রাতিরিক্ত গরমে দেহে যে হাওয়া প্রবেশ করে, তা নাসিকা গহ্বর বা নেজাল সাইনাসগুলোর মাধ্যমে ভেতরে যায়। এরপর নেজোফ্যারিংস এবং ওরোফ্যারিংস হয়ে ট্র্রাকিয়ার মাধ্যমে তা ফুসফুসে পৌঁছায়। নাকের ভেতরের মিউকাস মেমব্রেনের কাজ হলো অতিরিক্ত ঠান্ডা ও শুকনো হাওয়াকে কিছুটা জলীয় এবং গরম করে ফুসফুসের উপযোগী করে তোলা।
কিন্তু বাংলার মতো অতিরিক্ত আর্দ্রতাপ্রধান আবহাওয়ায় হঠাৎ এই তাপমাত্রা বদলে গেলে শরীরের এই স্বাভাবিক সুরক্ষাকবচ আর কাজ করতে পারে না। বাইরের অসহনীয় আর্দ্রতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পর শরীর যখন হঠাৎ অত্যন্ত দ্রুত একটি ঠান্ডা পরিবেশে পৌঁছায়, তখন নেজাল মেমব্রেনের মিউকাসগুলোর ক্ষরণ আচমকা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ঠান্ডা ও শুষ্ক হাওয়া নাককে আরও শুকনো করে দিয়ে সরাসরি ফুসফুসের ব্রঙ্কিওলস-এ পৌঁছে যায়।
ব্রঙ্কোস্প্যাজমের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য প্রভাব
ফুসফুসের গভীরে এই শুষ্ক ও ঠান্ডা হাওয়া আচমকা ঢুকে পড়লে শ্বাসনালী তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। এসি ঘরে প্রবেশ করার আগে পর্যন্ত ব্রঙ্কিওলসগুলো যে আর্দ্র ও গরম হাওয়া পাচ্ছিল, তা হঠাৎ এসির তীব্র ঠান্ডার সংস্পর্শে আসায় ‘ব্রঙ্কোস্প্যাজম’ ঘটে। অর্থাৎ, শ্বাসনালী চট করে সংকুচিত হয়ে বন্ধ হয়ে যায়।
এই আকস্মিক সংকোচনের ফলে ফুসফুসে যেমন অক্সিজেনযুক্ত বাতাস প্রবেশ করতে পারে না, তেমনি কার্বন ডাই অক্সাইডযুক্ত বাতাসও বেরোতে পারে না। এর ফলে দেহে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকে এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বাড়তে থাকে, যা শরীরকে বিপন্ন করে তোলে। এই ব্রঙ্কোস্প্যাজমের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে প্রথমে তীব্র কাশি এবং পরবর্তীকালে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়।
থার্মাল শক থেকে বাঁচার উপায়
এই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকেরা কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, রোদ থেকে ফিরেই সঙ্গে সঙ্গে এসির ঠান্ডা ঘরে ঢোকা যাবে না। প্রথমে ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় কিছুক্ষণ বসে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এসি ঘরের তাপমাত্রা কখনোই অত্যন্ত কমিয়ে রাখা উচিত নয়। ঘরের তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখলে শরীর সহজে বাইরের আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারে। এছাড়া, এসি ঘর থেকে হঠাৎ করে কড়া রোদে বেরোনোও সমান ক্ষতিকর। তাই বাইরে বেরোনোর কিছু সময় আগে এসি বন্ধ করে ঘরের পরিবেশকে স্বাভাবিক নিয়মে বাইরের তাপমাত্রার উপযোগী হতে দেওয়া প্রয়োজন।
