শ্মশানে শেষকৃত্য হলেও মিলছে না সার্টিফিকেট! পুরসভার দুয়ারে হাহাকার প্রবাসীদের, স্তব্ধ বার্থ-ডেথ পোর্টাল – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
কলকাতা: বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে তড়িঘড়ি রাতের বিমানে কলকাতা ফিরেছিলেন বেঙ্গালুরু নিবাসী শিলাদিত্য লাহিড়ি। দক্ষিণ কলকাতার বিখ্যাত কেওড়াতলা শ্মশানে নিয়ম মেনে শেষকৃত্য সম্পন্ন হলেও মেলেনি কোনো ক্রিমেশন বা ডেথ সার্টিফিকেট (ডিসি)। এমনকি এক সপ্তাহ কেটে গেলেও মোবাইলে আসেনি নথির কোনো ডাউনলোড লিংক। শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সেরে বৃদ্ধা মাকে নিয়ে দ্রুত বেঙ্গালুরু ফেরার কথা থাকলেও, ডেথ সার্টিফিকেট না মেলায় থমকে গিয়েছেন শিলাদিত্য। কারণ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিমা বা পরবর্তী আইনগত কাজের জন্য এই সার্টিফিকেট অপরিহার্য। অনির্দিষ্টকালের জন্য কলকাতায় আটকে থেকে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।
কেবল শিলাদিত্যই নন, একই ভোগান্তির শিকার বালিগঞ্জের পরাগ সেনও। এক আত্মীয়ের মৃত্যুর পর শ্মশান থেকে শুধু খরচের স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে পুরসভায় যোগাযোগ করতে। অথচ ধর্মতলায় কলকাতা পুরসভার সদর দপ্তরে গিয়ে জানা যাচ্ছে, ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়ার কাজ পুরোপুরি বন্ধ!
প্রতিদিন এই ভোগান্তির তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। পুরসভার তথ্য অনুযায়ী—
- কেওড়াতলা শ্মশান: দৈনিক ৮০ থেকে ১০০টি মরদেহ।
- নিমতলা শ্মশান: প্রতিদিন ১০০ থেকে ১২০টি মরদেহ।
- অন্যান্য শ্মশান (গড়িয়া, বিরজুনালা, কাশী মিত্র ইত্যাদি): দৈনিক ২৫ থেকে ৩০টি।
সব মিলিয়ে কলকাতা পুর এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫০টি লাশ দাহ হলেও, জুলাইয়ের শেষ থেকেই স্তব্ধ হয়ে রয়েছে ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার প্রক্রিয়া। এর ফলে পেনশন চালু, এলআইসি বা ব্যাংকের ডিপি/এফডি-র টাকা তোলা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের মতো জরুরি কাজ সম্পূর্ণ আটকে রয়েছে।
একই চিত্র বার্থ সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রেও! কলকাতা পুরসভার সদর ও বোরো অফিস মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২৫ থেকে ১৪০টি জন্ম নিবন্ধনের আবেদন জমা পড়ে। মেয়ের পাসপোর্ট রিনিউ করানোর জন্য মাসখানেক আগে আবেদন করেও শংসাপত্র পাননি মানিকতলার বাসিন্দা রাজা সরখেল। ফলে বয়স্ক থেকে শুরু করে শিশু— সর্বস্তরের মানুষ আজ চরম বিপাকে। সল্টলেকসহ রাজ্যজুড়ে ছবিটা প্রায় একই।
কেন বন্ধ পোর্টাল? পুরসভা সূত্রের খবর, জন্ম ও মৃত্যু সংক্রান্ত রাজ্য সরকারের সরকারি পোর্টালটি আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। পুর আধিকারিকদের দাবি, সম্প্রতি ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (SIR) কাজ চলাকালীন জমা পড়া কিছু জন্ম ও মৃত্যু সার্টিফিকেটের সত্যতা নিয়ে ধন্দ তৈরি হয়। জালিয়াতির আশঙ্কা থেকে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থেই সাময়িকভাবে পোর্টাল বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী নাগরিকদের প্রশ্ন, “দুর্নীতি বা তদন্তের জন্য সাধারণ মানুষকে কেন এই বিপুল ভোগান্তি পোহাতে হবে?”
কবে স্বাভাবিক হবে পরিস্থিতি? কলকাতা পুরসভা কর্তৃপক্ষ এখনো নির্দিষ্ট করে কোনো আশ্বাসের কথা জানাতে পারেনি। তবে শীর্ষ স্তরের খবর অনুযায়ী, আগামী সোমবার (১০ অগস্ট) নাগাদ পুনরায় এই পোর্টাল চালু হতে পারে, যদিও সে বিষয়ে বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত নিশ্চিত বার্তা মেলেনি। ফলে প্রতিদিনই পুরসভার সদর দপ্তর ও বোরো অফিসগুলিতে ভিড় জমাচ্ছেন অসংখ্য দিশেহারা মানুষ।
