সীমান্তে অনুপ্রবেশ রুখতে বিএসএফের সাপ ও কুমির বাহিনী কতটা কার্যকর হবে

পূর্ব ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত সুরক্ষিত করতে এবং অনুপ্রবেশে সম্পূর্ণ লাগাম টানতে এক অভিনব পরিকল্পনার কথা ভাবছে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (BSF)। সীমান্তের কাঁটাতার বিহীন নদী ও জলাভূমি এলাকায় প্রাকৃতিক পাহারাদার হিসেবে সাপ এবং কুমির মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে বাহিনীর। তবে বিএসএফের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। শিলিগুড়ির ডাবগ্রাম বনদপ্তরের কর্মীদের মতে, প্রাণীদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং।
সাপ কেন পাহারাদার হিসেবে ব্যর্থ হতে পারে
বনদপ্তরের কর্মীদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাপকে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা প্রায় আসাম্ভব। অরিথ দে নামে এক বনকর্মী জানিয়েছেন, সাপকে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ছেড়ে দিলে সে সেখানেই থাকবে—এমন গ্যারান্টি নেই। এছাড়া সাপ পোষ মানে না, ফলে তাকে দিয়ে পাহারা দেওয়ার বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে কঠিন। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
- বিচরণক্ষেত্র: সাপ সাধারণত ১০০ মিটারের বেশি এলাকায় ঘোরাফেরা করে না। কিন্তু পরিবেশ পছন্দ না হলে সে দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে।
- প্রজাতির ভিন্নতা: সব সাপ সব পরিবেশে বাঁচে না। ডাবগ্রামের বনকর্মীরা জানাচ্ছেন, বিষাক্ত সাপ যেমন গোখরো সাধারণত খড় বা শুকনো স্থানে থাকে, তারা জলাভূমিতে থাকতে পারবে না। অন্যদিকে, জলে যে ‘জলঢোরা’ সাপ পাওয়া যায়, তার কোনো বিষ নেই।
- বাস্তুতন্ত্রের সংকট: কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় প্রচুর পরিমাণে সাপ ছেড়ে দিলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হতে পারে। সাপের সংখ্যা বেড়ে গেলে ইঁদুর বা তাদের শিকার কমে যাবে, ফলে খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে।
কুমির মোতায়েনের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
সাপের তুলনায় কুমির মোতায়েনের বিষয়টি কিছুটা ইতিবাচক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদি পর্যাপ্ত খাবার এবং বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে একটি নির্দিষ্ট জলাধারে কুমির রাখা সম্ভব। তবে খোলা সীমান্ত বা খরস্রোতা নদীতে কুমিরকে দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় আটকে রাখা কঠিন। পাশাপাশি, মানুষের যাতায়াত রয়েছে এমন এলাকায় কুমির রাখা সাধারণ গ্রামবাসীদের জন্যও বিপদের কারণ হতে পারে।
বিএসএফের কৌশলী অবস্থান ও বিতর্ক
সম্প্রতি মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ প্রবেশের অভিযোগ এবং ঢাকা পুলিশের বিভিন্ন দাবির প্রেক্ষিতে বিএসএফ কড়া অবস্থান নিয়েছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এই ‘প্রাকৃতিক বাধা’ তৈরির ভাবনাটি একটি মাস্টারস্ট্রোক হতে পারে বলে বাহিনীর একাংশ মনে করলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় কাটছে না। বনদপ্তরের মতে, কৃত্রিমভাবে প্রাণীদের ব্যবহার করে সীমান্ত পাহারা দেওয়া কেবল ব্যয়বহুল নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্যও বিঘ্নিত করতে পারে।
একঝলকে
- সীমান্তে অনুপ্রবেশ রুখতে সাপ ও কুমির ব্যবহারের পরিকল্পনা বিএসএফের।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপ পোষ মানে না এবং নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ী হয় না।
- বিষাক্ত সাপ জলজ পরিবেশে থাকতে অক্ষম।
- অতিরিক্ত সাপ মোতায়েন করলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যশৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি।
- কুমির ব্যবহারের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত খাবার ও বদ্ধ পরিবেশের প্রয়োজন।
