সুকান্তের ভাইপো থেকে বাংলার শেষ বাম মুখ্যমন্ত্রী, ‘ব্র্যান্ড বুদ্ধর’ উত্থান ও পতনের অজানাকথা – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
কলকাতা: বাংলার রাজনীতিতে এক বর্ণময় অধ্যায়ের নাম বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এই নেতা যেভাবে জ্যোতি বসুর উত্তরসূরি হিসেবে নবান্নের দখল নিয়েছিলেন, তা আজও রাজনৈতিক মহলে চর্চার বিষয়। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইপো হওয়ার পারিবারিক পরিচিতি ছাপিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন আপসহীন বামপন্থী ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে।
ছাত্র রাজনীতি থেকে মসনদ
১৯৪৪ সালে কলকাতায় জন্ম বুদ্ধদেবের। প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তনী বুদ্ধদেব ১৯৬৬ সালে সি.পি.আই(এম) দলে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের প্রথম মন্ত্রিসভাতেই তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের দায়িত্ব পান তিনি। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় মোড় আসে ২০০০ সালে। জ্যোতি বসুর অসুস্থতার কারণে রাজ্যের হাল ধরেন তিনি। ২০০১ এবং ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বেই অভাবনীয় জয় পায় বামেরা।
‘ব্র্যান্ড বুদ্ধ’ ও শিল্পায়নের স্বপ্ন
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমল মানেই ছিল ‘শিল্প বনাম কৃষি’র এক কঠিন লড়াই। তাঁর স্লোগান ছিল— “কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ”। তথ্যপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে ভারী শিল্প, সবক্ষেত্রেই বিনিয়োগ টানতে মরিয়া ছিলেন তিনি। সিঙ্গুরে টাটাদের ন্যানো কারখানা আনার সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর স্বপ্নের প্রোজেক্ট। সেই সময় ‘ব্র্যান্ড বুদ্ধ’ এবং তাঁর দ্রুত কাজের শৈলী বা ‘Do it Now’ সংস্কৃতি রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন জোয়ার এনেছিল।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ও পতনের শুরু
শিল্পায়নের স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলন এবং নন্দীগ্রামে পুলিশি গুলির ঘটনা বাম সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জমি আন্দোলন এবং জঙ্গলমহলের মাওবাদী সমস্যা বুদ্ধদেবের প্রশাসনিক দক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
২০১১-র পরিবর্তন ও প্রস্থান
২০১১ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজেও নিজের কেন্দ্র যাদবপুর থেকে পরাজিত হন। হারের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে দলের শীর্ষ পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেও দল তা শুরুতে মানেনি। তবে শেষ কয়েক বছর বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছিলেন পাম অ্যাভিনিউয়ের সাদামাটা ফ্ল্যাটে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলার এই শেষ বাম মুখ্যমন্ত্রী।

