৬ থেকে ১৯৪! কীভাবে অসাধ্য সাধন করে পিগমি হগ বাঁচাল আসাম? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
September 10, 20265:33 pm
প্রায় ৩০ বছর আগে মানসের ঘাসজমি থেকে যে ছয়টি ক্ষুদ্র বুনো শুয়োরকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তাদেরই উত্তরসূরিরা অবশেষে ফিরে এল নিজেদের পুরনো ঠিকানায়। পৃথিবী থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পিগমি হগ (Pygmy Hog)-কে বাঁচাতে ১৯৯৬ সালে আসামের মানস জাতীয় উদ্যানের কুরিবিল তৃণভূমি থেকে মাত্র ছ’টি প্রাণী নিয়ে শুরু হয়েছিল প্রজনন ও সংরক্ষণ কর্মসূচি।
চলতি বছরের জুনে সেই একই কুরিবিল এলাকায় ১৫টি পিগমি হগকে জঙ্গলে উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ন’টি স্ত্রী এবং ছ’টি পুরুষ পিগমি হগ রয়েছে। গত প্রায় ন’বছর ধরে ওই এলাকায় পিগমি হগের কোনো নিশ্চিত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি, ফলে ঘাসজমিতে তাদের এই পুনরুজ্জীবন সংরক্ষণকর্মীদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং এক সাফল্য।
পিগমি হগ কনজারভেশন প্রোগ্রাম (PHCP)-এর আওতাতেই এই সফল পুনর্বাসন সম্ভব হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে মানস জাতীয় উদ্যানে মোট ছ’ দফায় পিগমি হগ ছাড়া হয়েছে। এই সর্বশেষ ১৫টি সহ মানসে মোট ৭৮টি পিগমি হগকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। আর পুরো আসামজুড়ে এই প্রজনন ও পুনর্বাসনের সংখ্যা এখন পৌঁছে গেছে ১৯৪-এ।
একসময়ে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ তৃণভূমি অঞ্চলে অবাধে বিচরণ করত এই বিরল প্রজাতির ক্ষুদ্র বুনো শুয়োর। Porcula salvania প্রজাতির এই প্রাণী পৃথিবীর অন্যতম বিরল স্তন্যপায়ী এবং ভারতের একমাত্র স্থানীয় বুনো শুয়োর। বিশ শতকের দিকে তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় একসময় তাদের পুরোপুরি বিলুপ্ত বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কয়েকটি মাত্র বেঁচে থাকা প্রাণীর খোঁজ মেলেই শুরু হয় আজকের এই দীর্ঘ লড়াই ও সফলতার যাত্রা।
হিমালয়ের পাদদেশের লম্বা ও স্যাঁতসেঁতে ঘাসজমিতেই পিগমি হগের মূল বসবাস। ঘাসের আড়ালেই তারা খাদ্য সংগ্রহ করে, বাসা বানায় এবং শাবক লালনপালন করে। তাই এই প্রাণীটিকে রক্ষা করার অর্থ কেবল একটি বিরল প্রজাতিকে বাঁচানো নয়, বরং তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আস্ত তৃণভূমির বাস্তুতন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়া।
সংরক্ষণকর্মীদের সবচেয়ে স্বস্তির খবর হলো, বন্য পরিবেশে জন্ম নেওয়া পিগমি হগের সংখ্যা এবার বন্দি দশায় জন্ম নেওয়া প্রাণীদের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের বাইরেও বন্য পরিবেশে তাদের টিকে থাকার এবং বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে কাজ কেবল মানসে সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কেন্দ্রের ‘স্পেসিস রিকভারি প্রোগ্রাম’-এর আওতায় পরিবেশ মন্ত্রক এবং ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার (WII) যৌথ উদ্যোগে পিগমি হগকে তাদের ঐতিহাসিক বিচরণভূমির অন্য অঞ্চলেও ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। সম্ভাব্য এই তালিকার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জলদাপাড়া এবং উত্তরপ্রদেশের কিছু উপযুক্ত তৃণভূমিও রয়েছে। তবে বন্যপ্রাণী ছাড়ার আগে তাদের বাসস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার সম্ভাবনা কঠোরভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মানস উদ্যানে আরও প্রায় ৮০টি পিগমি হগ ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে বন্য পরিবেশে অন্তত ৩০০টি প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণীর একটি স্বনির্ভর ও স্বাধীন জনগোষ্ঠী গড়ে তালাই এই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। ১৯৯৬ সালে স্রেফ ছয়টি প্রাণী নিয়ে যে মহৎ প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল, তিন দশক পর তাদের বংশধরদের হাত ধরে কুরিবিলের ঘাসজমি আজ নতুন প্রাণের সঞ্চারে মুখরিত।
