বিদায় কিংবদন্তি: প্রয়াত বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক মার্ক টুলি, শোকস্তব্ধ প্রধানমন্ত্রী থেকে মুখ্যমন্ত্রী – এবেলা
এবেলা ডেস্কঃ
নয়াদিল্লি ও কলকাতা: ভারতীয় সাংবাদিকতা জগতের এক মহীরুহের পতন ঘটল। ব্রিটিশ নাগরিক হয়েও যাঁর হৃদস্পন্দনে মিশে ছিল ভারত, সেই প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক মার্ক টুলি আর নেই। রবিবার দিল্লির এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। গত ২১ জানুয়ারি অসুস্থতা নিয়ে সাকেতের ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে রাজনৈতিক ও সংবাদ মহলে।
টালিগঞ্জের বাংলো থেকে বিশ্বমঞ্চ: এক অনন্য সফর
১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জের ৭ নম্বর রিজেন্ট পার্কের এক বিশাল বাংলোয় জন্ম মার্ক টুলির। ব্রিটিশ রাজত্বের সেই দিনগুলিতে এক ধনাঢ্য পরিবারে বড় হওয়া টুলির শৈশব কেটেছিল কিছুটা আড়ালে। কিন্তু নিয়তি তাঁকে বারবার টেনে এনেছে এই মাটির টানেই। পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ডে গেলেও, ১৯৬৪ সালে বিবিসির প্রতিনিধি হিসেবে ভারতে ফিরে আসেন তিনি। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তিনি হয়ে ওঠেন বিবিসির ভারতের মুখ।
ইতিহাসের সাক্ষী: কেরিয়ারের মাইলফলক
টুলির সাংবাদিকতা ছিল ভারতের বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল। তাঁর তীক্ষ্ণ কলম ও গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বিশ্ববাসী জেনেছে ভারতের একের পর এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের কথা।
- ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ: যুদ্ধের ময়দান থেকে সঠিক খবর পৌঁছে দেওয়া।
- জরুরি অবস্থা: ইন্দিরা গান্ধীর শাসনকালে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নির্ভীক সাংবাদিকতা।
- অপারেশন ব্লু স্টার ও ইন্দিরা হত্যাকাণ্ড: শিখ দাঙ্গা ও পরবর্তী উত্তাল সময়ের নিখুঁত বিশ্লেষণ।
- রাজীব গান্ধী হত্যা ও বাবরি মসজিদ ধ্বংস: নব্বইয়ের দশকের ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষদর্শী।
‘দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’: সম্মান ও স্বীকৃতি
ছেলের ভাষায়, মার্ক টুলি ছিলেন মনেপ্রাণে ভারতীয়, যদিও তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্টের অধিকারী ছিলেন। ভারতের সংস্কৃতি, ধর্ম এবং রাজনীতিকে তিনি যতটা গভীর থেকে চিনেছিলেন, তা বহু ভারতীয়র কাছেও ছিল বিস্ময়কর। ‘দ্য হার্ট অব ইন্ডিয়া’ সহ একাধিক কালজয়ী গ্রন্থের রচয়িতা টুলি ২০০২ সালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে ‘নাইটহুড’ এবং ২০০৫ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হন।
শোকবার্তা: মোদি ও মমতার শ্রদ্ধাঞ্জলি
মার্ক টুলির প্রয়াণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট বার্তায় জানান, “ভারত ও ভারতীয়দের সঙ্গে মার্ক টুলির এক আত্মিক যোগাযোগ ছিল। তাঁর কাজ ও লেখনীর মাধ্যমে সেই গভীর টান বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর প্রয়াণ সাংবাদিকতা জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি।”
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, “বিখ্যাত সাংবাদিক মার্ক টুলির প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তিনি ভারতকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। আমরা তাঁকে সবসময় আমাদের পরিবারেরই একজন হিসেবে গণ্য করেছি। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই।”
বর্ষীয়ান সাংবাদিক সতীশ জ্যাকব জানিয়েছেন, টুলির চলে যাওয়া মানে একটি যুগের অবসান। কলকাতার টালিগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা রবিবার দিল্লিতে এসে থেমে গেল, রেখে গেল কয়েক দশকের অসামান্য সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার।

