রবীন্দ্র বিরোধী ভাবমূর্তি ঘোচাতে মরিয়া বিজেপি, মিয়াঁপুর গ্রামের নতুন নাম হচ্ছে রবীন্দ্রনাথনগর
উত্তরপ্রদেশের লখিমপুর খেরি জেলায় এক ঐতিহাসিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। জেলার মহম্মদী বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ‘মিয়াঁপুর’ গ্রামের নাম পরিবর্তন করে ‘রবীন্দ্রনাথনগর’ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই নতুন নামকরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রহীন ও অধিকারহীন অবস্থায় থাকা কয়েকশ হিন্দু পরিবারের হাতে জমির মালিকানা স্বত্ব তুলে দিয়ে এক বড় সামাজিক বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
রবীন্দ্রনাথনগর ও সাংস্কৃতিক রাজনীতির নতুন মোড়
মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের এই পদক্ষেপের পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমীকরণ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিরোধী পক্ষ প্রায়ই বিজেপির বিরুদ্ধে রবীন্দ্র-আদর্শ বিরোধী হওয়ার অভিযোগ তোলে। সেই ভাবমূর্তি ঘোচাতেই কি বিশ্বকবির নামে এই জনপদের নামকরণ? রাজনৈতিক মহলে এমন প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, জাতীয় সংগীতের রচয়িতার প্রতি সম্মান জানাতেই এই সিদ্ধান্ত।
কংগ্রেসকে আক্রমণ ও ইতিহাসের পুনর্গঠন
জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নাম পরিবর্তনের যৌক্তিকতা নিয়ে সরব হন। পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারকে লক্ষ্য করে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি করেন:
- পরিচয় সংকট: তিনি প্রশ্ন তোলেন, গ্রামে কোনো ‘মিয়াঁ’ না থাকা সত্ত্বেও কেন এর নাম মিয়াঁপুর রাখা হয়েছিল। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্বার্থে আসল পরিচয় লুকিয়ে রাখার জন্যই এমন নাম দেওয়া হয়েছিল।
- অধিকার বঞ্চিত শরণার্থী: পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে আশ্রয় নেওয়া ৩৩১টি বাংলাদেশি হিন্দু পরিবারের হাতে এদিন জমির মালিকানা বা পাট্টা তুলে দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, কংগ্রেস এদের ভোট নিলেও দীর্ঘকাল কোনো আইনি অধিকার দেয়নি।
বঞ্চিতদের অধিকার ও উন্নয়ন প্রকল্পের জোয়ার
লখিমপুর খেরি সফরে যোগী আদিত্যনাথ কেবল নাম বদলেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং একগুচ্ছ উন্নয়নমূলক কর্মসূচির সূচনা করেছেন:
- বিশাল বিনিয়োগ: জেলার উন্নয়নের জন্য ১,৩১১ কোটি টাকার মোট ৫৩৮টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করা হয়েছে।
- উপজাতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্বীকৃতি: থারু উপজাতির ৪,৩৫৬টি পরিবার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বংশধরদের ২,৩৫০টি পরিবারের হাতে জমির মালিকানা নথি তুলে দেওয়া হয়েছে।
- মামলা প্রত্যাহার: থারু সম্প্রদায়ের মানুষদের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে দায়ের করা সমস্ত ‘মিথ্যা’ মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ ও পারিবারিক রাজনীতির অবসান
সমাজবাদী পার্টিকে আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আগে উন্নয়ন কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবার বা বিশেষ এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের ২৫ কোটি মানুষই তাঁর পরিবার এবং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, নতুন জমির অধিকার পাওয়ার পর এখন থেকে পুলিশ বা বনদপ্তর আর কাউকে অহেতুক হয়রানি করতে পারবে না।
এই সফরের মাধ্যমে যোগী আদিত্যনাথ একদিকে যেমন জাতীয়তাবাদী ও রবীন্দ্র-চেতনার মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে প্রান্তিক ও উদ্বাস্তু পরিবারগুলোকে আইনি স্বীকৃতি দিয়ে বড় ধরনের ভোটব্যাংক সুসংহত করার কৌশল নিয়েছেন।
এক ঝলকে
- মিয়াঁপুর গ্রামের নাম বদলে রাখা হলো ‘রবীন্দ্রনাথনগর’।
- ৩৩১টি বাংলাদেশি হিন্দু শরণার্থী পরিবার পেলেন জমির মালিকানা স্বত্ব।
- থারু উপজাতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ৪,০০০-এর বেশি পরিবারের হাতে পাট্টা হস্তান্তর।
- লখিমপুর খেরিতে ১,৩১১ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন।
- থারু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে থাকা পুরনো সমস্ত মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা।
