মধ্যপ্রাচ্য সংকটে নতুন মোড় আর্থিক গ্যারান্টি চাইছে ইউএই এবং ক্ষতিপূরণ দাবি ইরানের

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের দাবানল এবার নতুন করে আর্থিক ও কূটনৈতিক সংকট তৈরি করছে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই সংঘাতের প্রভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ওয়াশিংটনের কাছে বিশাল অংকের আর্থিক নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে ইরানও বসে নেই; তেহরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই যুদ্ধ থেকে আমেরিকাকে বের করে আনার উপায় খুঁজছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর এই আর্থিক দাবি হোয়াইট হাউসকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে।
আমেরিকার ওপর আর্থিক ঝুঁকির মেঘ
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির জন্য আমেরিকার কাছে ‘ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাকস্টপ’ বা আর্থিক সুরক্ষা কবচ চেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে আমেরিকার প্রতিদিন গড়ে ৮৯০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এমন অবস্থায় ইউএই-র এই দাবি যদি মানা হয়, তবে সৌদি আরব বা কাতারের মতো অন্যান্য দেশগুলোও একই ধরনের ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে। এতে মার্কিন অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউএই-র অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুবাইয়ের বিখ্যাত ‘দ্য ফেয়ারমন্ট দ্য পাম’ হোটেল এবং ফুজিরাহ তেল রপ্তানি টার্মিনাল হামলার শিকার হয়েছে। এই টার্মিনালটি প্রতিদিন ১০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ছিল। এছাড়া আমাজনের দুটি ডেটা সেন্টার ধ্বংস হওয়ায় পুরো অঞ্চলের ব্যাংকিং ও ক্লাউড পরিষেবা বিঘ্নিত হয়েছে। এই বিশাল ক্ষতি সামাল দিতেই দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান খালিদ মোহাম্মদ বালামা মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সঙ্গে ‘কারেন্সি সোয়াপ’ বা মুদ্রা বিনিময়ের প্রস্তাব দিয়েছেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর পুনর্গঠন ব্যয়
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে চলেছে। বিশ্লেষকদের মতে:
- অবকাঠামো মেরামত: সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর নাগরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো মেরামতে প্রয়োজন হবে ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
- তেল ও গ্যাস খাত: শুধুমাত্র তেল এবং গ্যাস ক্ষেত্রগুলো পুনরায় সচল করতে ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
- ইসরায়েলের ব্যয়: ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ১১.২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যার অর্ধেকের বেশি খরচ হয়েছে যুদ্ধের প্রথম ২০ দিনেই।
ইরানের ২৭০ বিলিয়ন ডলারের দাবি
যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢেলেছে ইরানের সাম্প্রতিক দাবি। তেহরান তাদের প্রতিবেশী দেশ—ইউএই, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানের কাছে ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। এছাড়া ইরান ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর তাদের আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতিও দাবি করছে। যদি তারা এই স্বীকৃতি পায়, তবে সেখান দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজ থেকে ইরান টোল আদায়ের অধিকার পাবে। হিসেব অনুযায়ী, শুধুমাত্র অপরিশোধিত তেলের ট্যাঙ্কারগুলো থেকেই মাসে প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে ইরান।
ডলারের আধিপত্য ও চীনের প্রভাব
এই যুদ্ধ ডলারের বৈশ্বিক অবস্থানের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যেই তেল বাণিজ্যে ডলারের পরিবর্তে চীনা ইউয়ান ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছে। গত অক্টোবরে দুবাইতে চীনের দ্বিতীয় ‘ইউয়ান ক্লিয়ারিং ব্যাংক’ খোলা হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে চীনের এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
একঝলকে
- ইউএই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য আমেরিকার কাছে আর্থিক গ্যারান্টি চেয়েছে।
- যুদ্ধে আমেরিকার দৈনিক খরচ প্রায় ৮৯০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলার।
- অবকাঠামো মেরামতে উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রয়োজন হবে অন্তত ৬০ বিলিয়ন ডলার।
- ইরান প্রতিবেশী ৫টি দেশের কাছে ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
- তেল বাণিজ্যে ডলারের বদলে চীনা ইউয়ান ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ছে।
- হরমুজ প্রণালীতে টোল আদায়ের অধিকার চাইছে তেহরান।
