অপ্রয়োজনীয় বেতন রুখতে কড়া নবান্ন! সরকারি চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের কাজের ‘অডিট’ শুরু করল রাজ্য

পশ্চিমবঙ্গের সরকারি দফতর ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের নিয়ে এক নজিরবিহীন ও বড় পদক্ষেপ করল শুভেন্দু অধিকারীর নতুন সরকার। বিভিন্ন সরকারি দফতরে আউটসোর্সিং বা থার্ড পার্টি এজেন্সির মাধ্যমে নিযুক্ত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখতে এবং আর্থিক অপচয় রুখতে একটি ব্যাপক ‘ম্যানপাওয়ার অডিট’ (Manpower Audit) শুরু করেছে রাজ্য সরকার। নবান্ন সূত্রের এই খবরের পর চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের একাংশের মধ্যে ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তীব্র হয়েছে।
কেন এই আকস্মিক অডিট? স্ক্যানারে ‘ওয়েবেল’ ও বেসরকারি এজেন্সি
দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন বেসরকারি ভেন্ডর বা থার্ড পার্টি এজেন্সির মাধ্যমে হাজার হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব এবং সরকারি তহবিলের অপব্যবহার নিয়ে নানা মহল থেকে অভিযোগ উঠছিল। নবান্ন সূত্রে জানা গেছে, আগে ‘ওয়েবেল’ বিভিন্ন বেসরকারি এজেন্সির কাছ থেকে কর্মী সংগ্রহ করে সরকারি দফতরে পাঠাত। কিন্তু ২০২৩ সালের পর থেকে ওয়েবেল টেন্ডারে অংশগ্রহণ করা বন্ধ করে দেয়। পরিবর্তে বর্তমানে কর্মিবর্গ বিভাগের অধীনে থাকা ‘ওয়েবেল টেকনোলজি লিমিটেড’ (WTL) বিভিন্ন দফতরে কর্মী সরবরাহের দায়িত্ব সামলাচ্ছে। এই হাতবদলের পর সামগ্রিক নিয়োগের কাঠামোয় কোনও গলদ বা আর্থিক তছরুপ রয়েছে কিনা, তা পরিষ্কার করতেই এই অডিটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই অডিটের মূল লক্ষ্য:
- বিভিন্ন অফিসে ঠিক কত সংখ্যক চুক্তিভিত্তিক কর্মী বহিরাগত এজেন্সির মাধ্যমে কাজ করছেন, তা চিহ্নিত করা।
- তাঁদের কাজের ধরণ ঠিক কী এবং কতদিন ধরে তাঁরা কর্মরত রয়েছেন, তার খতিয়ান নেওয়া।
- আউটসোর্সড এজেন্সিগুলির মাধ্যমে তাঁদের বেতন বাবদ রাজ্য কোষাগার থেকে প্রতি মাসে ঠিক কত টাকা খরচ হচ্ছে, তার নিখুঁত ও স্বচ্ছ হিসাব তৈরি করা।
সবচেয়ে বেশি নজরে ‘বাংলা সহায়তা কেন্দ্র’ (BSK)
রাজ্য সরকারের এই অডিট প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি স্ক্যানারে রয়েছে ‘বাংলা সহায়তা কেন্দ্র’ বা বিএসকে। সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দিতে পশ্চিমবঙ্গের ২৩টি জেলা জুড়ে প্রায় ৪,০০০ বাংলা সহায়তা কেন্দ্র চালানো হয়। প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি বিএসকে-তে তিনজন চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিযুক্ত থাকেন এবং এই প্রায় ১২,০০০ কর্মীই থার্ড পার্টি ভেন্ডরের মাধ্যমে নিযুক্ত হয়েছেন।
“আদৌও দরকার আছে?” সন্দিহান শীর্ষ আধিকারিকেরা
এক শীর্ষ সরকারি আধিকারিকের দাবি, সাধারণ মানুষকে ডিজিটাল পরিষেবা দেওয়ার জন্য যেখানে ইতিমধ্যেই ‘কমন সার্ভিস সেন্টার’ (CSC)-এর মতো ব্যবস্থা চালু ছিল, সেখানে নতুন করে বিএসকে খোলার কোনও জরুরি প্রয়োজন ছিল না। বর্তমানে বহু বিএসকে-তে কাজ অত্যন্ত কম বা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলস্বরূপ, কাজ ছাড়া এই বিপুল সংখ্যক কর্মীকে প্রতি মাসে বেতন দেওয়ার কারণে রাজ্য সরকারের কোষাগার থেকে প্রতি বছর একটি বড় অঙ্কের অর্থের অপচয় হচ্ছে।
একদিকে যখন ২৬ হাজার চাকরি বাতিল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিয়োগে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা আনার মেগা গ্যারান্টি দিচ্ছেন এবং অন্যদিকে ১ জুন থেকে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্পের টাকা সরাসরি অ্যাকাউন্টে পাঠাতে প্রশাসন ‘মিশন মোড’-এ ভুয়ো নাম ছাঁটার কাজ করছে— সেই প্রশাসনিক শুদ্ধিকরণের সমান্তরালে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের এই ‘ম্যানপাওয়ার অডিট’ রাজকোষের অপচয় বন্ধে এক অত্যন্ত দূরদর্শী পদক্ষেপ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
