যুদ্ধবিরতি উড়িয়ে লেবাননের গভীরে ইজ়রায়েলি সেনা, নাবাতিয়ে শহর ও বিউফোর্ট দুর্গ হাতছাড়া – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
গত ১৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও তা কার্যত কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। সমস্ত আন্তর্জাতিক আবেদনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লেবাননের আরও গভীরে প্রবেশ করেছে ইজ়রায়েলি ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ)। দক্ষিণ লেবাননের অন্যতম কৌশলগত ও বড় শহর নাবাতিয়ে এখন পুরোপুরি ইজ়রায়েলি সেনার নিয়ন্ত্রণে। একই সঙ্গে লেবাননের ঐতিহাসিক পাহাড়ঘেরা বিউফোর্ট দুর্গটিও দখল করে নিয়েছে তারা। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম লেবাননের এত বড় কোনো শহর আইডিএফের দখলে গেল, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
লেবাননের সেনা সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শনিবারই নাবাতিয়ে শহরের বাইরে অবস্থান নিয়েছিল ইজ়রায়েলি সেনা। এরপর রাতের অন্ধকারে লিতানি নদী পেরিয়ে তারা মূল শহরে ঢুকে পড়ে। গত কয়েক দিন ধরে এই শহরে ব্যাপক বিমান ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছিল ইজ়রায়েলের বায়ুসেনা। লেবাননের ন্যাশনাল নিউজ় এজেন্সির (এনএনএ) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ড্রোন হামলায় নাবাতিয়েতে বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন বহু মানুষ।
কৌশলগত বিপর্যয় ও হিজ়বুল্লার প্রতিরোধ ভাঙার দাবি
ইজ়রায়েলের দাবি, নাবাতিয়ে শহরটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজ়বুল্লার প্রধান ডেরা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এই শহরকে হিজ়বুল্লামুক্ত করতেই মূলত এই অভিযান চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইজ়রায়েলি সেনা পুরো নাবাতিয়ে শহরটি অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। সেখানে হিজ়বুল্লার শক্তিশালী দ্বিস্তরীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছে আইডিএফ। এই আগ্রাসনের ফলে ভৌগোলিকভাবে লেবাননের পশ্চিম বেক্কা উপত্যকা দেশটির দক্ষিণ প্রান্ত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা লেবাননের সামরিক প্রতিরক্ষার জন্য একটি বড় ধাক্কা।
আগ্রাসনের কারণ ও আঞ্চলিক প্রভাব
এই আগ্রাসনের পটভূমি তৈরি হয়েছিল কিছু দিন আগেই, যখন ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু হিজ়বুল্লার বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। ইজ়রায়েলের মূল লক্ষ্য দক্ষিণ লেবাননে হিজ়বুল্লার শক্ত ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষিত করা। তবে এই অভিযানের ফলে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। লেবাননের স্বাস্থ্য দফতরের হিসাব অনুযায়ী, কেবল মার্চ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইজ়রায়েলি হামলায় তিন হাজারেরও বেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাও বিপুল।
ইজ়রায়েলের এই লাগাতার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান এই হামলার বিরুদ্ধে বার বার সোচ্চার হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ১০ দফা দাবিতেও লেবাননে হামলা বন্ধের বিষয়টি বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইজ়রায়েলের এই গভীর অনুপ্রবেশ লেবানন সরকারকে আরও কোণঠাসা করে ফেলবে। একই সঙ্গে ইরান ও ইজ়রায়েলের মধ্যকার পরোক্ষ সংঘাতকে এটি সরাসরি যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে ফেলবে।
