ওয়াশিংটন ও তেহরানের শান্তি চুক্তিতে ক্ষুব্ধ তেল আবিব, ট্রাম্পের পাশ থেকে কি সরে দাঁড়াচ্ছে ইজরায়েল? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হতে চলায় বিশ্বজুড়ে স্বস্তির হাওয়া বইলেও চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান শক্তি ইজরায়েলে। পশ্চিমা বিশ্ব এই সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরার আশা করলেও তেল আবিব একে তাদের জাতীয় সুরক্ষার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও মার্কিন যৌথ হামলার পর দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগ ইজরায়েলের রণকৌশলকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
শীর্ষ নেতৃত্বের তীব্র ক্ষোভ ও অনমনীয় সামরিক অবস্থান
এই সমঝোতা চুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ইজরায়েলের অতি-ডানপন্থী জোট সরকারের শরিকরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি ইজরায়েলের ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না এবং ইজরায়েল কোনো অধীনস্থ অঙ্গরাজ্য নয়। হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনা বা সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নই ওঠে না বলে তিনি দাবি করেন। একই সুর মিলিয়ে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এটিকে সমগ্র মুক্ত বিশ্বের জন্য একটি ‘বিপজ্জনক চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে নিজস্ব কৌশলে পথ চলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইজরায়েল কাৎজ স্পষ্ট করেছেন যে, লেবানন, সিরিয়া এবং গাজা উপত্যকা থেকে তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না এবং প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এ বিষয়ে কঠোর বার্তা পাঠিয়েছেন।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার দায়
চুক্তির জের ধরে শুধু সরকার পক্ষই নয়, বিরোধী দলগুলোও প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা শুরু করেছে। বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিড এই চুক্তিকে ইজরায়েলের বিদেশ ও নিরাপত্তা নীতির সবচেয়ে বড় পরাজয় হিসেবে চিহ্নিত করে এর সম্পূর্ণ দায় প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপিয়েছেন। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ইয়ার গোলান দাবি করেছেন, সেনাবাহিনীর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সাফল্য নেতানিয়াহুর নিষ্ক্রিয়তার কারণে বিলীন হয়ে গেছে এবং চুক্তির চূড়ান্ত মুহূর্তে দেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দুর্বল ও একাকী অবস্থায় ছিলেন।
ইজরায়েলের মূল আপত্তি ও সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ইজরায়েলের মূল আপত্তির জায়গা হলো এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লেবানন সীমান্তসহ সমস্ত ফ্রন্টে বৈরিতার অবসান ঘটাতে হবে, যা তাদের দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা অভিযানের পরিপন্থী। এছাড়া তেহরান ও ওয়াশিংটনের দ্বিপাক্ষিক এই আলোচনায় তাদের সব চেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যু্ক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল পর্যায় থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, চুক্তিতে তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ রোধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি এবং ইরানের বাজেয়াপ্ত করা বিপুল অর্থ অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা হিজবুল্লাহ, হুথি ও হামাসের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আর্থিক শক্তি আরও বাড়িয়ে তুলবে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও নীরব থাকলেও ইরান যাতে কোনোভাবেই এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে না পারে, সেজন্য সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন, যা আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
