তৃণমূলের অন্দরে বিরোধী কে, বিধানসভায় ‘ফ্লোর টেস্ট’ না করানোয় স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ হাইকোর্ট – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন আইনি ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছে। বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের কোন শিবির ‘আসল’ বিরোধী দলের মর্যাদা পাবে, তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের দ্বন্দ্ব এবার আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ঋতব্রত শিবিরকে বিরোধী দলের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে অধ্যক্ষ রথীন্দ্র বসুর একতরফা সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে মমতা শিবির। এই মামলার শুনানিতে অধ্যক্ষের নিরপেক্ষতা ও কার্যপদ্ধতি নিয়ে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট।
আদালতের তীব্র ভর্ৎসনা ও স্পিকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
মামলার শুনানিতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও রাজ্য সরকারের আইনজীবীকে একের পর এক তীক্ষ্ণ প্রশ্নে বিদ্ধ করেন। বিধানসভার অধিবেশন না ডেকে বা ‘ফ্লোর টেস্ট’ (সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষা) না করিয়ে স্পিকার কীভাবে নিজের চেম্বারে বসে বিরোধীদের ভাগ্য নির্ধারণ করলেন, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছে আদালত। বিচারপতির স্পষ্ট বক্তব্য, “অধ্যক্ষ ঘরে বসে কীভাবে জানলেন বিরোধীদের কোন পক্ষে বেশি লোক আছে? অধিবেশন না ডেকে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কি ক্ষমতা আছে?” বিরোধী দলনেতার নাম জমা পড়ার পরও স্পিকার কেন কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে অন্য পক্ষের প্রস্তাবের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, সেই প্রশ্নও তোলে আদালত। জবাবে রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য সুপ্রিম কোর্টের নজির টেনে দাবি করেন যে, অধ্যক্ষ কেবল ‘রাবার স্ট্যাম্প’ নন, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে তাঁকে সব দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
সই জাল-কাণ্ড ও বিরোধী মর্যাদার জটিল সমীকরণ
এই সংঘাতের মূলে রয়েছে বিধায়কদের সই জালের অভিযোগ এবং সিআইডি তদন্ত। মমতা শিবিরের পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে স্পিকারকে চিঠি দিয়ে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু এর পরেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির ৫৮ জন বিধায়কের সই সংবলিত একটি তালিকা জমা দিয়ে নিজেদের মূল বিরোধী পক্ষ হিসেবে দাবি করে। পাল্টা মমতা শিবিরের দাবি, এই তালিকায় সই জাল করা হয়েছে। অন্যদিকে, আইনি লড়াইয়ের মধ্যেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, “কারা প্রধান বিরোধী দল তা জানতে ফ্লোর টেস্ট হোক, তাতেই দুধ কা দুধ-জল কা জল হয়ে যাবে।”
রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য পরিণতি
১৮ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া বাজেট অধিবেশনের আগে এই আইনি জটিলতা নতুন বিজেপি সরকারের জন্য এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। সর্বদলীয় বৈঠকে ঋতব্রত শিবির যোগ দিলেও শাসক দলের পক্ষ থেকে তাদের অবস্থান নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। যদি আদালত স্পিকারের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে ফ্লোর টেস্টের নির্দেশ দেয়, তবে বিধানসভার অভ্যন্তরেই স্পষ্ট হয়ে যাবে কার পক্ষে কতজন বিধায়ক রয়েছেন। এর ফলে একদিকে যেমন তৃণমূলের সাংগঠনিক ফাটল জনসমক্ষে চলে আসবে, অন্যদিকে বিধানসভার কার্যপরিচালনা এবং বিরোধী দলনেতার সাংবিধানিক পদ প্রাপ্তি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি হবে। আপাতত বুধবার পরবর্তী শুনানির দিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।
