১৪ দিনে ৪৯ কেজি ওজন হ্রাস! ২০৯ কেজির যুবককে নতুন জীবন দিল দিল্লি AIIMS, চিকিৎসা বিজ্ঞানে অলৌকিক সাফল্য! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক অভূতপূর্ব ও অবিশ্বাস্য সাফল্যের নজির গড়লেন দিল্লির ‘অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস’ (AIIMS)-এর চিকিৎসকেরা। চরম স্থূলতায় আক্রান্ত ৩২ বছর বয়সী যুবক বিবেককে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে এনে নতুন জীবন উপহার দিলেন তাঁরা। দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে জীবনমরণ লড়াই। অবশেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন তিনি।
চরম শারীরিক জটিলতা ও স্লিপ অ্যাপনিয়া বিভেকের ওজন যখন ২০৯ কেজিতে পৌঁছায়, তখন তাঁর ‘বডি মাস ইনডেক্স’ (BMI) বেড়ে দাঁড়ায় অবিশ্বাস্য ৭৪ কেজি/বর্গমিটার (সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক BMI থাকা উচিত ১৮.৫ থেকে ২৪.৯)। অতিরিক্ত ওজনের কারণে হাঁটাচলা তো বন্ধ হয়েইছিল, সাথে থাবা বসিয়েছিল ‘অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ (OSA)। রাতে ঘুমানোর সময় বারবার তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যেত। ফলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ায় রাতে ‘সিপ্যাপ’ (CPAP) মেশিনের সাহায্য নিতে হতো। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল উচ্চ রক্তচাপ, প্রাক-ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, মারাত্মক হাঁটু ব্যথা এবং চরম মানসিক অবসাদ।
অপারেশন থিয়েটার নয়, হাসপাতালের বেডেই জটিল চিকিৎসা! হাসপাতালে ভর্তির পর বিবেকের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। সিপ্যাপ মেশিনেও শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক না থাকায় চিকিৎসকেরা প্রথমে শ্বাসনালীতে টিউব বসান। কিন্তু পরিস্থিতি আরও জটিল হলে জরুরি ভিত্তিতে তাঁর গলার শ্বাসনালীতে ছিদ্র করে ‘ট্র্যাকিওস্টমি’ করতে হয়। পেটের প্রকাণ্ড আকারের কারণে তাঁকে অপারেশন থিয়েটারের (OT) টেবিলে পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না! ফলে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের সাধারণ বেডেই এই অতীব ঝুঁকিযুক্ত পদ্ধতি সম্পন্ন করেন চিকিৎসকেরা।
৩২ দিনের দীর্ঘ প্রস্তুতি ও মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি লড়াই পর পর ৩২ দিন ট্র্যাকিওস্টমির মাধ্যমে বিবেককে সিপ্যাপ সাপোর্টে রাখা হয়। দীর্ঘদিন ভেন্টিলেটর সাপোর্টে থাকায় তাঁর ফুসফুসে সংক্রমণ (Ventilator-Associated Infection) দেখা দিলে কড়া অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সার্জন, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, ফিজিশিয়ান, ডায়েটেশিয়ান ও ফিজিওথেরাপিস্টদের একটি দক্ষ দল গঠন করা হয়। অস্ত্রোপচারের উপযুক্ত করতে তাঁকে ৩২ দিন ধরে ‘অত্যন্ত কম ক্যালোরির ডায়েট’ (Very Low-Calorie Diet)-এ রাখা হয় এবং নিয়মিত শ্বাসের ব্যায়াম করানো হয়।
অলৌকিক অস্ত্রোপচার ও আকস্মিক পরিবর্তন দীর্ঘ ৩২ দিনের টানা প্রস্তুতির পর, ২৪ জুলাই AIIMS-এর মেটাবলিক ও ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ ড. মঞ্জুনাথ মারুতি পোল এবং তাঁর দল বিবেকের ‘ওয়ান অ্যানাস্টোমোসিস গ্যাস্ট্রিক বাইপাস’ (OAGB) অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।
অস্ত্রোপচারের পর মাত্র ১৪ দিনের মাথায় ঘটে অলৌকিক পরিবর্তন! বিবেকের ওজন ২০৯ কেজি থেকে একধাক্কায় কমে দাঁড়ায় ১৬০ কেজিতে—অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহে ঝরে যায় প্রায় ৪৯ কেজি ওজন! তাঁর পেটের পরিধিও ১৯৮ সেন্টিমিটার থেকে কমে হয় ১৫৫ সেন্টিমিটার।
সুস্থ শরীরে হাসিমুখে বাড়ি ফেরা অস্ত্রোপচারের পর বিভেকের শ্বাসকষ্ট পুরোপুরি দূর হয়েছে। অতিরিক্ত মেদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ায় তাঁর হৃদপিণ্ড, হাড় ও জোড়ের ওপর থেকে চাপ কমেছে। ৬ আগস্ট তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়। ড. মঞ্জুনাথ পোল জানান, অ্যানেস্থেসিওলজিস্টদের নিখুঁত নজরদারি, ড. নবল বিক্রমের নেতৃত্বে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং ডায়েটেশিয়ানদের সঠিক নির্দেশনার ফলেই এই প্রায়-আসাম্ভব কাজটি সম্ভব হয়েছে। আপাতত তিনি চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকবেন।
