মা চাইলেন মাত্র ৩টি গয়না, বিদ্যাসাগর কী করলেন সেদিন?

বিদ্যাসাগরের জনকল্যাণমূলক কাজের নেপথ্যে মায়ের প্রেরণা ও তাঁর উপার্জনের উৎস নিয়ে নতুন চর্চা
নিজস্ব প্রতিবেদন: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্ম নিয়ে নতুন করে আলোকপাত করলেন তাঁর বংশধর অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্প্রতি ‘সংস্কৃতি বিচিত্রা’ নামক একটি ইউটিউব চ্যানেলের পডকাস্টে তিনি জানান, বিদ্যাসাগরের জনহিতকর কাজের অনুপ্রেরণা এবং নারীকল্যাণমূলক চিন্তাধারার মূল উৎস ছিলেন তাঁর মা ভগবতী দেবী।
দুই শতক আগে বীরসিংহ গ্রামে মায়ের জন্য গয়না গড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যাসাগর যে ‘অলঙ্কার’ উপহার দিয়েছিলেন, তা আজও টিকে আছে ভগবতী দেবীর নামাঙ্কিত বালিকা বিদ্যালয় এবং গ্রামীণ হাসপাতালের মাধ্যমে। পডকাস্টে অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেন, বিদ্যাসাগরের মহানুভবতার নেপথ্যে তাঁর মায়ের উদার মানসিকতার বড় প্রভাব ছিল। তিনি বলেন, বিদ্যাসাগরের মতো প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তির অবদান সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্ম যথেষ্ট অবগত নয়, যা অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয়। বিদ্যাসাগরের মেজো মেয়ে কুমুদিনী দেবীর বংশধর হিসেবে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে এই মনীষীর বিস্মৃত অবদানগুলো জনসমক্ষে আনার জন্য কাজ করছেন।
বিদ্যাসাগরের আর্থিক স্বচ্ছলতা ও তার উৎস নিয়েও নতুন তথ্য উঠে এসেছে। কর্মজীবনের শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে শিক্ষকতা করলেও, ১৮৫১ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত সাত বছর তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি মাসিক কয়েকশো টাকা বেতন পেতেন। অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, সেই যুগে যখন এক ভরি সোনার দাম ছিল ১৬ টাকা, তখন বিদ্যাসাগরের এই বেতন ছিল তৎকালীন মানদণ্ডে অত্যন্ত সম্মানজনক।
বেতনের পাশাপাশি নিজের ছাপাখানা এবং পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের ব্যবসা থেকেও তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করতেন। সেই উপার্জিত অর্থ থেকেই তিনি আজীবন অকাতরে দানধ্যান করে গেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের সেই বিখ্যাত উক্তি— “বিদ্যাসাগরের মধ্যে আছে প্রাচীন ভারতের ঋষির প্রজ্ঞা, একজন ইংরেজের কর্মশক্তি এবং বাঙালি মায়ের কোমল হৃদয়”—প্রসঙ্গটি টেনে বক্তা বোঝাতে চেয়েছেন, কর্মজীবনে আপসহীন এবং উদারমনা ঈশ্বরচন্দ্রের ব্যক্তিগঠনে ভগবতী দেবীর ভূমিকা ছিল অনন্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উনিশ শতকের রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে বিদ্যাসাগরের যে প্রগতিশীল চিন্তা, তার বীজ বপন হয়েছিল তাঁর মায়ের হাত ধরেই। বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্ম নিয়ে এই নতুন চর্চা ও বিশ্লেষণ ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের দ্বার উন্মোচন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
