ছয় মুসলিম দেশের প্রতি ট্রাম্পের এই বিশেষ আগ্রহ কি নিছক ছাড়, নাকি গভীর কোনো ষড়যন্ত্র!

হোরমুজ প্রণালীতে উত্তপ্ত সামরিক পরিস্থিতি: মার্কিন কড়া হুঁশিয়ারি ও বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ
হোরমুজ প্রণালীতে মার্কিন সামরিক অবরোধ ঘোষণা করার পর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক কঠোর সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন, আমেরিকান নৌ-বেষ্টনী অতিক্রমের চেষ্টা করলে যে কোনো জাহাজকে নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করা হবে। চলমান এই উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে থাকলেও, সৌদি আরবসহ ছয়টি মুসলিম দেশের জন্য বিশেষ ছাড় ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন। মূলত নিজেদের কৌশলগত অবস্থান পোক্ত করতেই এই বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের কড়া হুঁশিয়ারি ও সামরিক অবস্থান
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যে বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, অবরোধ অমান্যকারী যে কোনো জাহাজের বিরুদ্ধে একইভাবে তা প্রয়োগ করা হবে। তাঁর দাবি, কঠোর নীতির প্রয়োগের ফলেই সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রে ৯৮.২ শতাংশ মাদক সরবরাহ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। ইরানের নৌবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প জানান, ইরানের মূল নৌ-শক্তি এখন সমুদ্রের তলদেশে বিলীন। তাঁর ভাষ্যমতে, এ পর্যন্ত দেশটির ১৫৮টি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ছোট ‘ফাস্ট অ্যাটাক’ জাহাজগুলো মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় কোনো হুমকি নয়।
হোরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি ও বাণিজ্যিক প্রভাব
ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার চলমান সামরিক উত্তেজনা ও অবরোধের প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে। এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। যুদ্ধের আগে হোরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন ১৩০ থেকে ১৫০টি জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু গত ৪৫ দিনের অস্থিরতার মধ্যে মাত্র ২৪৫টি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে। বর্তমানে প্রায় ৮০০টি জাহাজ এই প্রণালীতে আটকা পড়ে আছে বলে জানা গেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ছয় মুসলিম দেশের প্রতি নমনীয়তার কৌশলগত কারণ
অবরোধ আরোপ করা সত্ত্বেও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কুয়েত, কাতার এবং বাহরাইনের জাহাজ চলাচলে মার্কিন প্রশাসন কোনো বাধা দেবে না বলে জানিয়েছে। এই বিশেষ ছাড় দেওয়ার পেছনে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক একাধিক কারণ রয়েছে:
- মিত্র দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
- ইরানি হামলার জবাব: ৪০ দিনের যুদ্ধের সময় ইরানের বাহিনী একাধিকবার এই রাষ্ট্রগুলোর ওপর লক্ষ্যবস্তু তৈরি করেছিল। এই পরিস্থিতিতে মিত্রদের পাশে দাঁড়ানো ওয়াশিংটনের জন্য কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য।
- আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ: হোরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদী আধিপত্য ধরে রাখতে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সমর্থন বজায় রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
আধিপত্যের লড়াই ও ইসরায়েলের প্রস্তুতি
হোরমুজ প্রণালীতে ইরানের পেতে রাখা সমুদ্র মাইন অপসারণ এবং অঞ্চলটি পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আমেরিকা। অন্যদিকে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলও তৎপরতা বাড়িয়েছে। ইতোমধ্যেই বেন গুরিয়ান বিমানবন্দরে মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান মোতায়েন করা হয়েছে এবং মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে ইরানের দিকে অগ্রসর হতে দেখা গেছে। যদিও ইরানি বাহিনীর দাবি, তাদের পাল্টা সতর্কবার্তার পর মার্কিন রণতরী কিছুটা পিছিয়ে গেছে।
এক ঝলকে
- অবরোধের হুমকি: মার্কিন সামরিক বেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা করলেই জাহাজ ধ্বংসের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
- ছাড়প্রাপ্ত দেশ: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা নেই।
- নৌ-শক্তির ক্ষয়ক্ষতি: এখন পর্যন্ত ইরানের ১৫৮টি জাহাজ ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
- বাণিজ্যিক স্থবিরতা: হোরমুজ প্রণালীতে ৮০০টি জাহাজ আটকা পড়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
- সামগ্রিক লক্ষ্য: ইরানের পেতে রাখা নৌ-মাইন অপসারণ করে হোরমুজ প্রণালীতে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা আমেরিকার প্রধান উদ্দেশ্য।
