‘প্রতিহিংসা মেটাতে পকসো প্রয়োগ নয়’, দাম্পত্য মামলায় বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণ হাই কোর্টের – এবেলা

‘প্রতিহিংসা মেটাতে পকসো প্রয়োগ নয়’, দাম্পত্য মামলায় বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণ হাই কোর্টের – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

কলকাতা: দাম্পত্য কলহ এবং ডিভোর্সের মামলায় কঠোর ‘পকসো’ (POCSO) আইনের অপব্যবহার নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করল কলকাতা হাই কোর্ট। বীরভূমের একটি ডিভোর্স মামলায় পকসো আইনের অধীন গঠিত চার্জ এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের নির্দেশ বাতিল করে দিয়েছেন হাইকোর্টের বিচারপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়।

হাই কোর্টের সাফ বক্তব্য—কেবলমাত্র তদন্তকারী সংস্থার আবেদনের ভিত্তিতে বা শিখিয়ে-পড়িয়ে দেওয়া বয়ানের ওপর নির্ভর করে পকসোর মতো স্পর্শকাতর ও কঠোর ফৌজদারি ধারা যুক্ত করা যায় না।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

মামলাটির সূত্রপাত এক দম্পতির দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তিকে কেন্দ্র করে। সিউড়ি থানার পুলিশ প্রথমে ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) সাধারণ কিছু ধারায় তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জমা দিয়েছিল এবং বীরভূমের নিম্ন আদালত তা গ্রহণও করে। কিন্তু পরে একটি আবেদনের ভিত্তিতে ট্রায়াল কোর্ট ফের তদন্তের নির্দেশ দেয়।

পরবর্তীকালে সিআরপিসির ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় ওই দম্পতির মেয়ের গোপন বয়ান রেকর্ড করা হয়। নতুন এই বয়ানে মেয়েটি অভিযোগ করে, সে যখন ১৭ বছরের নাবালিকা ছিল, তখন তার বাবা তার সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছিলেন। এর ওপর ভিত্তি করেই মামলায় পকসো আইনের ৮, ১০ ও ১২ নম্বর ধারা যুক্ত করে বিশেষ আদালত। ট্রায়াল কোর্টের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন অভিযুক্ত পিতা।

হাই কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ

মামলার সমস্ত নথি খতিয়ে দেখে বিচারপতি অজয় কুমার মুখোপাধ্যায় একাধিক অসঙ্গতি তুলে ধরেন:

  • আগের বয়ানে অভিযোগের অনুপস্থিতি: পুলিশকে দেওয়া মেয়েটির প্রথম বয়ানে নাবালিকা বয়সে বাবার বিরুদ্ধে এমন কোনও গুরুতর অভিজ্ঞতার উল্লেখ ছিল না।
  • শিখিয়ে-পড়ানো বয়ান: পরে ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় নেওয়া বয়ানে হঠাৎ করে এই অভিযোগের উত্থান ঘটে। আদালতের মতে, এই বয়ানগুলি স্পষ্টতই ‘শিখিয়ে-পড়িয়ে’ নেওয়া হয়েছিল।
  • প্রতিহিংসার রাজনীতি: বিচারপতির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দাম্পত্য অশান্তির জের ধরে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার উদ্দেশেই পরবর্তীতে পকসোর মতো কঠোর আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে।

ট্রায়াল কোর্টকে বিশেষ বার্তা

পকসোর মতো গুরুতর ধারায় চার্জ গঠনের আগে নিম্ন আদালতের ঠিক কী ভূমিকা হওয়া উচিত, তাও স্পষ্ট করে দিয়েছে হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, ট্রায়াল কোর্টের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর পর্যাপ্ত উপাদান রয়েছে কি না তা নিজে যাচাই করা। অন্ধভাবে কেবল নতুন বয়ান জমা পড়ার ভিত্তিতেই পকসো প্রয়োগ করা অনুচিত।

মামলার বর্তমান স্থিতি

হাই কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে পকসো আইনের ৮, ১০ ও ১২ ধারায় গঠিত সমস্ত চার্জ বাতিল করা হলো। মামলাটি পুনরায় বীরভূমের আদালতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সেখানে পকসো ছাড়াই, একদম শুরুতে ভারতীয় দণ্ডবিধির যে সাধারণ ধারায় তদন্ত চলছিল, কেবল তার ভিত্তিতেই বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গার্হস্থ্য হিংসার মামলায় ৪৯৮-এ ধারার অপব্যবহার নিয়ে একাধিকবার সরব হয়েছে আদালত। এবার ডিভোর্সের মামলায় পকসো আইনের অপব্যবহার রোধে হাই কোর্টের এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *