২৬৬ কিমি ঝড় ও ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও অটুট, মেঘের ওপর ছুটছে ভারতীয় ট্রেন – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
September 5, 202611:00 am
জম্মু ও কাশ্মীরের রিয়াসি জেলায় চেনাব নদীর বুক চিরে গড়ে ওঠা ‘চেনাব রেল ব্রিজ’ বিশ্বজুড়ে ভারতীয় প্রকৌশল বিদ্যার এক অনন্য প্রতীক হয়ে উঠেছে। নদীর তলদেশ থেকে ৩৫৯ মিটার (১,১৭৮ ফুট) উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতুটি প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারের চেয়েও প্রায় ৩৫ মিটার উঁচু। উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুলা রেল লিঙ্ক (USBRL) প্রকল্পের অধীনে তৈরি এই আর্চ ব্রিজটি কাশ্মীর উপত্যকাকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সব ঋতুতেই নিরবচ্ছিন্নভাবে যুক্ত করেছে।
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিস্ময়কর পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ স্টিল ও কংক্রিট দিয়ে তৈরি ১,৩১৫ মিটার (৪,৩১৪ ফুট) দীর্ঘ এই সেতুর মূল আর্চটির দৈর্ঘ্য ৪৬৭ মিটার, যা বিশ্বজুড়ে দীর্ঘতম রেল আর্চগুলোর একটি। মেগা স্ট্রাকচারটিতে রয়েছে মোট ১৭টি স্প্যান এবং মূল আর্চকে সাপোর্ট দিচ্ছে ১৩০ মিটার উঁচু দুটি বিশাল পিলার। পুরো সেতুটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ২৭,০০০ টন স্টিল এবং ৬৬,০০০ ঘনমিটার কংক্রিট। নকশায় বিন্দুমাত্র ত্রুটি না রাখতে প্রতিটি স্টিল স্ট্রাকচার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নত ‘থ্রিডি টেকলা’ (3D Tekla) সফটওয়্যার।
প্রকৃতির সাথে লড়াই করে নির্মাণ হিমালয়ের অত্যন্ত দুর্গম পরিবেশে এই সেতু নির্মাণ করা ছিল প্রকৌশলীদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। শুরুতে ভারি যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর মতো কোনো রাস্তা না থাকায় ঘোড়া ও মানুষের পিঠে করে সামগ্রী বহন করতে হয়েছিল। পরবর্তীতে আর্চ নির্মাণের জন্য স্থাপন করা হয় বিশ্বের সর্বোচ্চ কেবল ক্রেন। ক্যান্টিলিভার পদ্ধতিতে দুই দিক থেকে কাজ শুরু করে ২০২১ সালের এপ্রিলে আর্চটিকে মাঝখানে নিখুঁতভাবে যুক্ত করা সম্ভব হয়।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও নাশকতার বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ ভৌগোলিক ঝুঁকি বিবেচনা করে সেতুটির সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নিখুঁত পরিকল্পনার কারণে সেতুটি ঘণ্টায় ২৬৬ কিলোমিটার গতির ঝড় এবং রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্প অনায়াসে সহ্য করতে পারে। এমনকি মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চরম শীতের মধ্যেও এর কার্যকারিতা অক্ষুণ্ণ থাকে। একই সাথে যেকোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে এটিকে সম্পূর্ণ বিস্ফোরণরোধী (Blast-resistant) করে ডিজাইন করা হয়েছে।
যোগাযোগে ঐতিহাসিক বিপ্লব প্রায় দুই দশকের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর নির্মিত এই মেগা সেতুটি বিশ্বজুড়ে নজর কেড়েছে এবং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে নিয়েছে। সেতুটি চালু হওয়ায় এবং বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের মতো আধুনিক ট্রেন চলাচল শুরু করায় কাটরা থেকে শ্রীনগর যাতায়াতের সময় নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। পাহাড়ি উপত্যকায় এই সেতু দেশের সামগ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
