গ্রেফতার তৃণমূল নেত্রী

গ্রেফতার তৃণমূল নেত্রী

রাজ্যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই বিগত জমানার থমকে থাকা একাধিক দুর্নীতির ফাইল একে একে পুনরায় খুলতে শুরু করেছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটা পৌরসভা। বাম জমানার শেষে এবং তৃণমূল জমানার দীর্ঘ সময় ধরে চলা দিনহাটা পৌরসভার ১৭টি আবাসন বা বিল্ডিং প্ল্যান জালিয়াতি মামলার ঠান্ডা ঘরে চলে যাওয়া ফাইল ফের সচল করেছে প্রশাসন। আর এই ফাইল খুলতেই কোচবিহারের রাজনীতিতে বড়সড় আলোড়ন ফেলে দিয়ে গ্রেফতার করা হলো প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত তৃণমূল নেত্রী তথা পৌরকর্মী মৌমিতা ভট্টাচার্যকে।

পাশাপাশি, এই জালিয়াতি কাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দিনহাটার প্রাক্তন পৌরপ্রধান তথা বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা গৌরীশঙ্কর মাহেশ্বরীর বাড়িতেও ম্যারাথন তল্লাশি চালাল পুলিশ।

কী এই ১৭টি বিল্ডিং প্ল্যান জালিয়াতি মামলা?

পুলিশ এবং পৌরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, দিনহাটা পৌরসভা এলাকায় নিয়ম বহির্ভূতভাবে নকশা অনুমোদন এবং জাল সই ও ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে অন্তত ১৭টি বহুতল ভবনের ব্লু-প্রিন্ট বা বিল্ডিং প্ল্যান পাস করানোর একটি বড়সড় চক্র সক্রিয় ছিল। এই জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার পাশাপাশি বিপজ্জনকভাবে পুর-আইন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবাসন তৈরি করা হয়েছিল। এই নিয়ে বিগত দিনে থানায় সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের হলেও, রাজনৈতিক প্রভাব ও তৎকালীন শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের চাপে পুলিশ প্রশাসন মামলাটিকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল বলে অভিযোগ।

তদন্তে গতি আসতেই জালে উদয়ন-ঘনিষ্ঠ নেত্রী

নতুন সরকারের কড়া নির্দেশে পুলিশ এই দুর্নীতির উৎস খুঁজতে নামতেই উঠে আসে পৌরকর্মী তথা সক্রিয় তৃণমূল নেত্রী মৌমিতা ভট্টাচার্যের নাম। তদন্তকারীদের দাবি:

  • প্রধান যোগসূত্র: মৌমিতা ভট্টাচার্য দিনহাটা পৌরসভার কর্মী হওয়ার সুবাদে ভেতরের সমস্ত গোপন ফাইল ও নথিপত্র জাল করার মূল দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন।
  • মন্ত্রীর ছায়া: এলাকায় তিনি প্রাক্তন মন্ত্রী উদয়ন গুহর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বৃত্তের লোক হিসেবে পরিচিত হওয়ায় তাঁর এই কাজে কেউ বাধা দেওয়ার সাহস পায়নি।
  • গ্রেফতারি: শনিবার রাতে দিনহাটা থানার পুলিশ দীর্ঘ জেরার পর বয়ানে একাধিক অসঙ্গতি মেলায় মৌমিতাকে সরকারি নথি জালিয়াতি ও চক্রান্তের ধারায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার করে।

প্রাক্তন পৌরপ্রধানের বাড়িতে তল্লাশি ও সই বিতর্ক

মৌমিতাকে গ্রেফতারের পাশাপাশি এই চক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা দেখতে শনিবার রাতেই দিনহাটার প্রাক্তন পৌরপ্রধান গৌরীশঙ্কর মাহেশ্বরীর বাসভবনে হানা দেয় পুলিশের একটি বিশেষ দল। তদন্তকারী আধিকারিকদের বক্তব্য, জালিয়াতি হওয়া ১৭টি বিল্ডিং প্ল্যানের কপিতে তৎকালীন পৌরপ্রধান হিসেবে গৌরীশঙ্কর মাহেশ্বরীর অফিসিয়াল সই ও সিলমোহর রয়েছে।

পুলিশ খতিয়ে দেখছে যে, এই সইগুলি কি গৌরীশঙ্করবাবু নিজেই ফাইলের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কাটমানি খেয়ে করেছিলেন, নাকি তাঁর অজান্তে মৌমিতা বা অন্য কোনো চক্র তাঁর সই জাল করেছিল। প্রাক্তন পুরপ্রধানের বাড়ি থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও ডায়েরি বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ।

রাজনৈতিক মহলে তোলপাড়

দিনহাটার রাজনৈতিক মহলের মতে, উদয়ন গুহর খাসতালুকে দাঁড়িয়ে তাঁরই অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নেত্রীর এই গ্রেফতারি এবং প্রাক্তন পুরপ্রধানের বাড়িতে পুলিশের হানা জেলা তৃণমূলের অন্দরে বড়সড় ফাটল ধরিয়ে দিল। বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের দাবি, এটি তো কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র; দিনহাটা পৌরসভা এবং উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের বিগত কয়েক বছরের সমস্ত খরচের অডিট ও তদন্ত হলে খোদ প্রাক্তন মন্ত্রী উদয়ন গুহর নামও এই দুর্নীতিতে সামনে আসবে। অন্যদিকে, এই ঘটনার পর থেকে দিনহাটার বর্তমান তৃণমূল নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ব্যাকফুটে চলে গিয়েছে। ধৃত মৌমিতা ভট্টাচার্যকে আজই কোচবিহার জেলা আদালতে পেশ করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে পুলিশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *