ঘন ঘন আবহাওয়ার সতর্কবার্তা কি ডেকে আনছে বিপজ্জনক ‘অ্যালার্ট ফ্যাটিগ’? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
হঠাৎ করেই মোবাইল ফোনটি তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে আসা জরুরি বার্তা দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে গেল চলমান মিটিং বা দৈনন্দিন ব্যস্ততা। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে কোনো বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা আপদকালীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে বার্তাটি খুলে দেখা গেল, এটি কেবলই সাধারণ বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি বা ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে দিল্লি-এনসিআর এলাকায় মোবাইল গ্রাহকদের কাছে এই ধরনের সতর্কবার্তা প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে আপদকালীন জরুরি সতর্কবার্তা ব্যবস্থার এমন ঢালাও ব্যবহার নিয়ে পরিবেশবিদ ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
প্রযুক্তির অপব্যবহার ও ‘অ্যালার্ট ফ্যাটিগ’-এর ঝুঁকি
ভারতের ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDMA), টেলিকম দফতর (DoT) এবং সি-ডট (C-DOT) যৌথভাবে ‘সচেত’ প্ল্যাটফর্মের অধীনে এই দুর্যোগ সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ‘সেল ব্রডকাস্ট’ প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট ছাড়াই নির্দিষ্ট এলাকার সব মোবাইলে একযোগে এই জরুরি বার্তা পাঠানো সম্ভব। ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো বড় বিপদের সময়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে এটি অত্যন্ত কার্যকরী এক প্রযুক্তি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, বরং এর অতিব্যবহারে। সাধারণ আবহাওয়ার পূর্বাভাসকেও যখন উচ্চমাত্রার শব্দ ও জরুরি বার্তার রূপ দিয়ে বারবার পাঠানো হয়, তখন জনমনে ‘অ্যালার্ট ফ্যাটিগ’ বা সতর্কবার্তাজনিত ক্লান্তি তৈরি হয়। এর ফলে মানুষ বারবার একই ধরনের বার্তা পেতে পেতে একসময় সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দেয়। ফলে ভবিষ্যতে যখন সত্যিই কোনো বড় বিপর্যয় আসবে, তখন হয়তো সাধারণ মানুষ এই সতর্কবার্তাকে আর গুরুত্ব সহকারে নেবে না, যা বড় ধরনের জীবন ও সম্পত্তিহানির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
মৌসম ভবনের অবস্থান ও টেকসই সমাধানের পথ
এই সমালোচনার জবাবে ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD) অবশ্য ভিন্ন যুক্তি দেখাচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই সতর্কবার্তাগুলো জেলা-ভিত্তিক দেওয়া হয়। একটি জেলার সব অংশের আবহাওয়া একরকম থাকে না, তাই কোথাও আকাশ স্বাভাবিক থাকলেও অন্য অংশে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি থাকতে পারে। তাছাড়া কৃষক ও মৎস্যজীবীদের মতো প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও সুরক্ষার জন্য এই পূর্বাভাসগুলো অত্যন্ত জরুরি। অনেকেই বার্তার বিস্তারিত অংশ না পড়ে বিভ্রান্ত হন বলেও আবহাওয়া দফতরের দাবি।
তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা ধরে রাখতে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সতর্কবার্তাগুলোর জরুরি ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস করার পরামর্শ দিচ্ছেন। সাধারণ তথ্য, আবহাওয়ার নিয়মিত নজরদারি এবং প্রকৃত জরুরি অবস্থার জন্য আলাদা স্তরের ও আলাদা শব্দের সতর্কবার্তা থাকা প্রয়োজন। দুর্যোগ মোকাবিলা প্রযুক্তির এই অভাবনীয় সাফল্যকে অর্থবহ রাখতে হলে সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখা জরুরি, কারণ যেকোনো সতর্কীকরণ ব্যবস্থার চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করে বার্তার প্রতি মানুষের তাৎক্ষণিক সাড়ার ওপর।
