জামাই ষষ্ঠীর পুণ্যলগ্নে শাশুড়িদের বিশেষ ব্রত, জানুন জামাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনার আসল নিয়ম – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামাজিক উৎসব জামাই ষষ্ঠী। শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে জামাইয়ের আত্মিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করতে এই উৎসবের জুড়ি মেলা ভার। এ বছর ২০২৬ সালে জামাই ষষ্ঠী পালিত হতে চলেছে ২০ জুন, শনিবার। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি ৪ আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। হিন্দু শাস্ত্র মতে, জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে সন্তান ও উর্বরতার দেবী ষষ্ঠীর আরাধনা করা হয়। এই বিশেষ দিনে জামাইয়ের মঙ্গল এবং দীর্ঘায়ু কামনায় শাশুড়িরা ভোর থেকে উঠে কিছু বিশেষ নিয়ম ও আচার পালন করে থাকেন।
ষষ্ঠী তিথি ও সময়ের যোগসূত্র
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে, এবারের ষষ্ঠী তিথি শুরু হচ্ছে ১৯ জুন ২০২৬, শুক্রবার বিকাল ৪:৫৯ মিনিটে এবং তিথির সমাপ্তি ঘটবে ২০ জুন ২০২৬, শনিবার বিকাল ৩:৪৬ মিনিটে। ফলে পুজো, জামাই বরণ এবং উৎসবের মূল অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হবে ২০ জুন শনিবার দিনেই। শনিবার সরকারি ছুটি থাকায় চাকুরিজীবী জামাই ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে উৎসবের আনন্দ আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় ভোরবেলার ব্রত ও নিয়মাবলী
জামাইয়ের সুখ, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করতে নতুন এবং অভিজ্ঞ শাশুড়িরা দিনটিতে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ব্রত পালন করেন। উৎসবের মূল প্রক্রিয়াটি শুরু হয় খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠার মাধ্যমে। শাশুড়িরা ভোরে উঠে স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্রে দেবী ষষ্ঠীর পুজো করেন এবং জামাইকে অন্নগ্রহণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আগে পর্যন্ত সম্পূর্ণ উপবাস রাখেন। পুজোর জন্য কাঁঠালপাতার উপর আম, জাম, কলা, লিচু, কাঁঠাল, করমচা, ১০৮টি দূর্বা, বাঁশের করুল এবং তালের পাখা দিয়ে বিশেষ ডালা সাজানো হয়।
জামাই বাড়িতে উপস্থিত হলে শুরু হয় বরণ পর্ব। শাশুড়িরা জামাইয়ের কপালে দই বা চন্দনের পবিত্র তিলক পরিয়ে আরতি করেন। এরপর পুজোয় নিবেদিত পবিত্র হলুদ সুতো, যা ‘ষষ্ঠীর ডোর’ নামে পরিচিত, সেটি জামাইয়ের কবজিতে বেঁধে দেওয়া হয়। ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করার পাশাপাশি তালের পাখার শীতল হাওয়া ও শান্তির জলের ছিটে দেওয়া এই উৎসবের অন্যতম প্রধান নিয়ম, যা জামাইয়ের জীবনের সমস্ত বাধা-বিপত্তি দূর করে আয়ু বৃদ্ধি করে বলে বিশ্বাস করা হয়।
ঐতিহ্যবাহী ভুরিভোজ ও সামাজিক প্রভাব
পূজা-পার্বণের নিয়ম শেষ হতেই শুরু হয় জামাই ষষ্ঠীর আসল আকর্ষণ অর্থাৎ ভূরিভোজ। ইলিশ মাছ, পোলাও, খাসির মাংস, গলদা চিংড়ি এবং হরেক রকমের মিষ্টির পাশাপাশি জ্যৈষ্ঠ মাসের মরশুমি ফল যেমন আম, জাম, লিচু ও কাঁঠাল দিয়ে জামাইকে রাজকীয় কায়দায় আপ্যায়ন করা হয়। বর্তমান কর্মব্যস্ত যুগে অনেক পরিবার বাড়িতে রান্নার ঝক্কি এড়াতে নামী রেস্তোরাঁ থেকে বিশেষ ‘জামাই ষষ্ঠী থালি’ অর্ডার করার দিকেও ঝুঁকছেন। খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি জামাই, মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নতুন পোশাক ও উপহার দেওয়ার রীতিও এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রাচীনকালে নিয়ম ছিল, মেয়ে পুত্রবতী না হওয়া পর্যন্ত বাবা-মা মেয়ের বাড়ি যেতেন না। সেই কারণে জামাই ষষ্ঠীর বাহানায় জামাইকে নিমন্ত্রণ করে মেয়ের মুখ দর্শন করার একটি সামাজিক চল শুরু হয়। কালক্রমে সেই প্রথাই আজ বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম আনন্দ উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। আধুনিক যুগে এই উৎসব কেবলই নিয়ম পালনের গণ্ডি ছাড়িয়ে শাশুড়ি ও জামাইয়ের পারস্পরিক স্নেহ, শ্রদ্ধা ও পারিবারিক মেলবন্ধনের এক অনন্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
