তিনবিঘায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া ঘিরে তীব্র উত্তেজনা! বিজিবির আপত্তি উড়িয়ে ‘রক্তাক্ত আন্দোলনে’র হুঁশিয়ারি ভারতীয়দের

মোদী সরকারের ‘স্মার্ট বর্ডার’ প্রকল্প এবং বাংলায় শুভেন্দু অধিকারী সরকারের জমানায় সীমান্ত সংলগ্ন জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার মেগা সিদ্ধান্তের পরই, উত্তরবঙ্গের রাজপাটে এক তীব্র সীমান্ত সংলগ্ন উত্তেজনা তৈরি হলো। কোচবিহারের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের তিনবিঘা করিডোর সংলগ্ন কুচলিবাড়ি এলাকায় কাঁটাতারহীন অংশে বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হতেই নতুন করে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB)-এর আপত্তি এবং সীমান্তের ওপারের পরোক্ষ মদতে স্থানীয় একাংশ মানুষের বাধার জেরে জমি মাপজোকের কাজ ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিজেপি বিধায়কের উপস্থিতিতে বিএসএফের মেগা ফ্ল্যাগ মিটিং এবং গ্রামবাসীদের ‘রক্তাক্ত আন্দোলনে’র কড়া হুঁশিয়ারি ছাব্বিশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক আবহে এক মস্ত বড় কূটনৈতিক ও কৌশলগত মোড় এনে দিল।

জমি মাপতেই বিজিবির ‘দাদাগিরি’, উত্তপ্ত কুচলিবাড়ি

স্থানীয় ও বিএসএফ (BSF) সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার থেকেই কুচলিবাড়ি সীমান্ত এলাকায় এই অশান্তির সূত্রপাত। দীর্ঘদিন ধরে তিনবিঘা করিডোরের এই বিস্তীর্ণ এলাকাটি কাঁটাতারহীন (Unfenced) অবস্থায় পড়েছিল। যার সুযোগ নিয়ে ওপার থেকে দেদার গরু পাচার, মানব পাচার এবং বেআইনি অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা ঘটছিল, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য মস্ত বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এই জট কাটাতে নব্য রাজ্য সরকার দ্রুত সীমান্ত সংলগ্ন জমি বিএসএফের হাতে হস্তান্তর করতেই শুক্রবার থেকে মাপজোকের কাজ শুরু করে কেন্দ্রীয় সংস্থা। আর তাতেই ‘লাইন অফ কন্ট্রোল’ লঙ্ঘনের ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে কাজ বন্ধ করার মরিয়া চেষ্টা চালায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BGB)।

বিএসএফের জোড়া ‘ফ্ল্যাগ মিটিং’, মাথা নোয়াতে নারাজ গ্রামবাসীরা

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে বিএসএফের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষ শনিবারই কোমর বেঁধে ময়দানে নামেন। এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে এবং বেড়া দেওয়ার কাজ সুনিশ্চিত করতে শনিবার দুটি পৃথক হাই-প্রোফাইল ‘ফ্ল্যাগ মিটিং’ (Flag Meeting) অনুষ্ঠিত হয়:

  • প্রথম বৈঠক: বিএসএফ এবং বিজিবির শীর্ষ আধিকারিকদের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্য রেখায় এই বৈঠক হয়, যেখানে ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয় দেশের সুরক্ষায় বেড়া নির্মাণ আটকানো যাবে না।
  • দ্বিতীয় বৈঠক: স্থানীয় ক্ষুব্ধ ভারতীয় গ্রামবাসী এবং এলাকার বিজেপি বিধায়ক ও সাংসদদের নিয়ে বিএসএফ কর্তারা দ্বিতীয় বৈঠকটি করেন।

এই মেগা বৈঠকেই স্থানীয় ভারতীয় নাগরিকদের একাংশ বিএসএফ এবং বিজিবির সামনেই চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনবিঘা এলাকায় দেশের সুরক্ষার স্বার্থে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজে কোনো ধরণের বাধা বা দাদাগিরি বরদাস্ত করা হবে না। বাংলাদেশি পক্ষের বা রাজনৈতিক কোনো চাপে ভারতীয় সেনা বা ভারতবাসী মাথা নোয়াবে না। প্রয়োজনে বর্ডারের জমি রক্ষা করতে এবং অনুপ্রবেশ রুখতে তাঁরা পুনরায় ‘রক্তাক্ত আন্দোলনে’র পথে হাঁটতেও পিছপা হবেন না।

রাজনৈতিক পালাবদল ও সুশাসনে ‘স্মার্ট বর্ডার’-এর মেগা অ্যাকশন

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আগামী এক বছরের মধ্যে ৬,০০০ কিমি সীমান্ত এলাকা ড্রোন ও থার্মাল রেডার দিয়ে দুর্ভেদ্য করার মেগা ঘোষণার পর কোচবিহারের এই অ্যাকশন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আগে জমি জটের কারণে যে সীমান্ত সুরক্ষা থমকে ছিল, রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর সেই জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছে যে, অনুপ্রবেশ ও জনবিন্যাস পরিবর্তন রুখতে তারা কতটা কঠোর।

একদিকে যখন বরাহনগরে তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে তৃণমূল নেতা শঙ্কর রাউত গ্রেফতার হচ্ছেন এবং অন্যদিকে রাজ্যের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ‘ম্যানপাওয়ার অডিট’ নিয়ে নবান্নে কড়া পদক্ষেপ চলছে— সেই অভ্যন্তরীণ ডামাডোলের সমান্তরালে উত্তরবঙ্গের তিনবিঘা সীমান্তে বিজিবির আপত্তি উড়িয়ে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার এই প্রশাসনিক জেদ ও জাতীয়তাবাদের হুঙ্কার ছাব্বিশের সুশাসনে এক মস্ত বড় মাইলফলক হয়ে রইল। খুব শীঘ্রই এই কুচলিবাড়ি সীমান্তে ভৌত বেড়ার পাশাপাশি ‘ডিজিটাল ফেন্সিং’ শুরু হবে বলে নবান্ন ও বিএসএফ সূত্রে খবর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *