তেলের বাজারে আগুন, তাও নিশ্চিন্ত ভারত! ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের আবহেও কীভাবে বাঁচল আমজনতার পকেট? – এবেলা

তেলের বাজারে আগুন, তাও নিশ্চিন্ত ভারত! ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের আবহেও কীভাবে বাঁচল আমজনতার পকেট? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও আমেরিকার মধ্যকার সাম্প্রতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে এক বড়সড় জ্বালানি সংকটের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে তেলের দামের তীব্র ওঠানামা এবং সামুদ্রিক পরিবহনে আকাশছোঁয়া ঝুঁকির কারণে যখন বিশ্বের বহু দেশ জ্বালানি রেশনিং ও কঠোর পরিবহন বিধিনিষেধ জারি করতে বাধ্য হয়েছে, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেল ভারতে। নিজের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ খনিজ তেলের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও ভারতে কোনো ধরনের জ্বালানি ঘাটতি তৈরি হয়নি। গত এক দশক ধরে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা শক্তিশালী জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আমদানির বহুমুখীকরণ এবং দূরদর্শী কূটনৈতিক পদক্ষেপের কারণেই এই যাত্রায় সুরক্ষিত রয়েছে দেশের অর্থনীতি।

আমদানির বহুমুখীকরণ ও বিকল্প রুট

ভারতের এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো একক কোনো অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে ওঠা। ২০০৬-০৭ সালে যেখানে ভারত মাত্র ২৭টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করত, বর্তমানে তা ৪০টিরও বেশি দেশে বিস্তৃত হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর মতো সংবেদনশীল নৌপথের ওপর চাপ কমাতে ভারত ওমানের ‘সোহার’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ফুজাইরাহ’ ও ‘খোরফাক্কান’ বন্দরের মাধ্যমে বিকল্প সামুদ্রিক পথ বেছে নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধকালীন নৌ-বিমা প্রিমিয়াম ৩০০ শতাংশ বাড়লেও এই বিকল্প কৌশলের কারণে ভারত সফলভাবে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পেরেছে। এমনকি গত এপ্রিল মাসেই ভেনিজুয়েলা থেকে ছাড়যুক্ত মূল্যে প্রায় ১২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করেছে দেশটি।

বিশাল মজুত ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা

আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ভারতের কাছে বর্তমানে প্রায় ৭৪ দিনের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক পেট্রোলিয়াম মজুত রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেল, ৬০ দিনের প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ৪৫ দিনের এলপিজি মজুত রয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা গুজব ছড়ালেও বাস্তবে দেশে কোনো জ্বালানি সংকট দেখা দেয়নি। এছাড়া জরুরি পণ্য আইনের আওতায় দেশীয় শোধনাগারগুলোতে এলপিজি উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে রান্নার গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘরোয়া অর্থনীতিকে বাঁচাতে খরিফ মৌসুমের জন্য ১৭৭ লাখ টন সার মজুত রাখা হয়েছে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য আড়াই লাখ কোটি টাকার লোন গ্যারান্টি ফ্রেমওয়ার্ক সম্প্রসারিত হয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবী জ্বালানি শৃঙ্খলা ও প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

বিশ্বের অন্তত ১৮টি দেশ যখন জ্বালানি সংকটে পড়ে কড়া বিধিনিষেধ কিংবা বাধ্যতামূলক ওয়ার্ক ফ্রম হোম নীতি চালু করেছে, তখন ভারত সরকার নাগরিকদের ওপর কোনো জোরপূর্বক নিয়ম চাপিয়ে দেয়নি। বরং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জ্বালানি সাশ্রয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেত্রবিশেষে ওয়ার্ক ফ্রম হোম ও অনলাইন মিটিংকে উৎসাহিত করা, ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহার এবং বিলাসবহুল পণ্য বা অপ্রয়োজনীয় সোনা আমদানির পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ পর্যটনে জোর দেওয়া। এই দূরদর্শী অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ ভারতীয় নাগরিককে সুরক্ষিতভাবে ফিরিয়ে আনার সফল উদ্ধার অভিযান বিশ্বমঞ্চে ভারতের কূটনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

এক ঝলকে

  • মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসংকটের মাঝেও প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশ থেকে তেল আমদানির নেটওয়ার্ক ও বিকল্প সামুদ্রিক রুট ব্যবহার করে সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছে ভারত।
  • যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের বুকে বর্তমানে প্রায় ৭৪ দিনের কৌশলগত জ্বালানি ও গ্যাস মজুত রয়েছে।
  • সংকটের প্রভাব থেকে আমজনতা ও অর্থনীতিকে বাঁচাতে এলপিজি উৎপাদন ৪০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এবং ক্ষুদ্র শিল্প ও কৃষকদের জন্য বিশেষ আর্থিক ও সার সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
  • অন্যান্য দেশের মতো জোরপূর্বক লকডাউন বা রেশনিং না করে নাগরিকদের স্বেচ্ছায় জ্বালানি সাশ্রয় ও গণপরিবহন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *