‘দিদি’ পেরেছিলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী’ ফেল! জনগণের ক্ষোভ কানে তোলেনি ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’, হাত কামড়াচ্ছে তৃণমূল

ছাব্বিশের মেগা বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ঐতিহাসিক ভরাডুবির নেপথ্যে এক চাঞ্চল্যকর অভ্যন্তরীণ কারণ সামনে এল। ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-এর মস্ত বড় দাওয়াই ‘দিদিকে বলো’ যেভাবে ২০২১-এর ভোটে ঘাসফুল শিবিরকে বৈতরণী পার করিয়েছিল, ঠিক তার উল্টো পথে হেঁটে ২০২৬-এর মহাবিপর্যয় ডেকে আনল খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের প্রকল্প ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’।
ভোটের ফল প্রকাশের পর এখন তৃণমূলের অন্দরমহলে তীব্র আক্ষেপ ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। দলেরই নেতাদের একাংশ মেনে নিচ্ছেন, এই হেল্পলাইন যদি আমলাতান্ত্রিক জটে আটকে না থেকে ঠিকঠাক কাজ করত, তবে হয়তো দেওয়ালের লেখাটা অনেক আগেই পড়া যেত এবং বাংলার এই মেগা রাজনৈতিক পালাবদল এড়ানো সম্ভব হতো।
‘দিদিকে বলো’র সাফল্যের ধারপাশ দিয়ে যায়নি ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’
তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও নবান্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ধাক্কা খাওয়ার পর তৎকালীন আইপ্যাক প্রধান প্রশান্ত কিশোরের পেশাদার কর্মীরা ‘দিদিকে বলো’ হেল্পলাইনের মাধ্যমে সরাসরি সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনতেন এবং যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তার সমাধান করতেন। ফলে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ অনেকটাই প্রশমিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ১৯ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন এই প্রকল্পকে নতুন নাম দিয়ে ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে ঘোষণা করলেন এবং ৮ জুন তা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলো, তখন থেকেই গলদ শুরু হয়।
এবার আর আইপ্যাক-এর পেশাদার কর্মীরা নন, হেল্পলাইনের রাশ তুলে দেওয়া হয়েছিল সরকারি শীর্ষস্তরের আমলাদের হাতে। আর এখানেই তৈরি হয় আসল দূরত্ব। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, এই হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করলে বেশিরভাগ সময়েই ফোন বেজে গিয়েছে, কেউ ধরেনি। ক্বচিৎ কখনও কেউ ফোন ধরলেও মিলেছে শুধু ফাঁকা আশ্বাস, কাজের কাজ বা সুরাহা কিছুই হয়নি।
চাষিদের কান্না থেকে মন্ত্রীর ‘বিশেষ বন্ধু’-র দাপট, ধামাচাপা নবান্নেই!
তৃণমূলের ভোট ম্যানেজার ও সরকারি আধিকারিকদের একাংশ এখন হাত কামড়াতে কামড়াতে যে সমস্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনছেন, তা চোখ কপালে তোলার মতো:
- আলুবলয়ের বিপর্যয়: এবারের বিধানসভা ভোটে দক্ষিণবঙ্গের আলুবলয় তথা পূর্ব বর্ধমান, হুগলি ও পশ্চিম মেদিনীপুরে কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তৃণমূল। অথচ এই আলু চাষ ও বিপণন নিয়ে সরকারের ভুল নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে বহু চাষি ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ হেল্পলাইনে ফোন করেছিলেন। সেই ফোনগুলি আমলই দেয়নি প্রশাসন। ফলে আলুবলয়ের এই ক্ষোভের আঁচ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টেরই পাননি।
- জঙ্গলমহলের মন্ত্রীর দাপট: ২০২১ সালে জঙ্গলমহল থেকে জেতা এক আদিবাসী মন্ত্রী ও তাঁর ‘বিশেষ বন্ধু’-র লাগাতার দাদাগিরি নিয়ে ওই সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে হেল্পলাইনে ভুরি ভুরি নালিশ ঠুকেছিলেন। কিন্তু আমলারা সেই সমস্ত বিস্ফোরক রিপোর্ট মমতার কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই দেননি।
- তোলাবাজি ও প্রোমোটিং চক্র: খোদ মমতার নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরেই স্থানীয় নেতাদের সিন্ডিকেট ও প্রোমোটিং নিয়ে মানুষের ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছিল। মানুষ বাধ্য হয়ে ভোটের আগে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে এ ব্যাপারে দরবার করেছিলেন। নবান্নের হেল্পলাইনে এই নিয়ে বহু ফোন গেলেও স্থানীয় নেতাদের আড়াল করতে কোনো সক্রিয়তাই দেখায়নি প্রশাসন।
২০২৪-এর জয় ডেকে এনেছিল আত্মতুষ্টি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা ১৯ থেকে কমে ১২ হয়ে যাওয়ায় তৎকালীন শাসকদল তৃণমূলের অন্দরে এক মারাত্মক আত্মতুষ্টি বাসা বেঁধেছিল। তারা ভেবেছিল ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ কাজ না করলেও ভোটব্যাঙ্ক অটুট রয়েছে। আর এই অহঙ্কার ও প্রচারের খামতির কারণেই প্রকল্পটির গুরুত্ব দিনে দিনে কমে যায় এবং মানুষও হেল্পলাইনের কথা ভুলে যায়।
যদিও এই মেগা ব্যর্থতার তত্ত্ব পুরোপুরি মানতে নারাজ বালিগঞ্জের বর্ষীয়ান তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পাল্টা দাবি, “এই কর্মসূচিতে প্রত্যন্ত এলাকার বহু মানুষ উপকৃত হয়েছেন। কৃষিমন্ত্রী হিসেবে আমিও এর থেকে পরামর্শ পেয়ে অনেক কাজ করেছি। এবারের ভোট হয়েছে ধর্মীয় উন্মাদনায়, তাই একে কর্মসূচির ব্যর্থতা বলে সরলীকরণ করা ঠিক হবে না।” তবে শোভনদেববাবু যাই বলুন না কেন, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘সহ-রাধুনি’ তত্ত্ব এবং বরাহনগরের শঙ্কর রাউতের মতো নেতাদের দাপট প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ আসলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমনের বদলে তা ধামাচাপা দেওয়ার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হলো ছাব্বিশের ব্যালট বাক্সে।
