বন্দুকের বাট দিয়ে মারধর, আলমারি লুঠ! শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার তৃণমূল নেতা

বন্দুকের বাট দিয়ে মারধর, আলমারি লুঠ! শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার তৃণমূল নেতা

উত্তর ২৪ পরগনার রাজনৈতিক অলিন্দে এক নজিরবিহীন কলঙ্কজনক ঘটনা সামনে এল। এবার তোলাবাজি, বন্দুকের বাট দিয়ে এক মহিলাকে নৃশংস মারধর, আলমারি থেকে টাকা লুঠ এবং শ্লীলতাহানির মারাত্মক অভিযোগে গ্রেফতার হলেন বরাহনগরের দাপুটে তৃণমূল নেতা শঙ্কর রাউত-সহ মোট ছয়জন। শুক্রবার রাতে বরাহনগর হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকায় এই তীব্র চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে। রাতেই পুলিশ গিয়ে অভিযুক্তদের আটক করে বরাহনগর থানায় নিয়ে আসে এবং পরবর্তীতে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়।

বিগত বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর তৃণমূলের রণকৌশল ও জনবিচ্ছিন্নতা নিয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক মন্তব্য এবং দক্ষিণ দমদমে তৃণমূল কাউন্সিলর সঞ্জয় দাসের রহস্যমৃত্যুর চরম অস্বস্তির মাঝেই, বরাহনগরের এই ঘটনা প্রাক্তন শাসকদলের ভাবমূর্তিতে আরও বড় ধাক্কা দিল।

৫০ হাজার টাকা তোলা না দেওয়ায় বন্দুকের বাট দিয়ে হেনস্থা, আলমারি লুঠ

বরাহনগর থানা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ বরাহনগরের হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা থেকে তীব্র গোলমালের খবর পায় পুলিশ। বনহুগলি এলাকার বাসিন্দা এক মহিলা এই মেগা অপরাধের শিকার হয়েছেন। তিনি শঙ্কর রাউত ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগকারী মহিলার বয়ান অনুযায়ী ঘটনার মূল বিবরণ:

  • ৫০ হাজার টাকার দাবি: শঙ্কর রাউত এবং তাঁর সহযোগীরা ওই মহিলার কাছে এসে আচমকা ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। মহিলা সেই বিপুল পরিমাণ তোলা বা কাটমানি দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করায় পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেয়।
  • বন্দুকের বাট দিয়ে মারধর: টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা ও তাঁর সঙ্গীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ, আগ্নেয়াস্ত্র বের করে তার বাট দিয়ে ওই মহিলাকে নৃশংসভাবে মারধর ও হেনস্থা করা হয়। মহিলার চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে ছুটে না এলে তাঁকে মেরেই ফেলা হতো বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারী।
  • লুঠপাট ও শ্লীলতাহানি: মহিলা আরও অভিযোগ করেছেন যে, মারধরের পর অভিযুক্তেরা জোরপূর্বক ঘরের ভেতর ঢুকে আলমারি থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা তুলে নেয় এবং তাঁর গলা থেকে একটি সোনার চেন ছিনিয়ে নেয়। এই তাণ্ডব চালানোর সময়ই অভিযুক্তেরা ওই মহিলার শ্লীলতাহানি ও যৌন হেনস্থা করে বলেও অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

গ্রেফতার শঙ্কর-সহ ৬ অনুগামী, প্রশাসনের গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ

থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর পুলিশ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অ্যাকশন নেয়। নেতা শঙ্কর রাউত ছাড়াও এই ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁর পাঁচ সঙ্গী— অর্পণ দত্ত, দেবজ্যোতি বণিক, সুবল দে, দেবাশিস দাস এবং সুব্রত সরকারকে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় প্রত্যেকেই তৃণমূলের প্রথম সারির কর্মী-সমর্থক এবং শঙ্করের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত। শঙ্করের বিরুদ্ধে এলাকায় তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজ চালানোর অভিযোগ নতুন নয়; এর আগেও বারাসতের এক নামী ব্যবসায়ীকে মারধর করার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, শুক্রবার রাতে একটি বিশেষ ‘পুলিশ’ (POLICE) লেখা গাড়িতে চেপে হাসপাতাল চত্বরে তাণ্ডব চালাতে গিয়েছিলেন শঙ্করেরা। যা দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং তাঁদের ঘিরে ধরে বিক্ষোভ দেখান। স্থানীয় সূত্রে খবর, সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের সময় যে সমস্ত গাড়ি প্রশাসন ব্যবহার করেছিল, তারই একটিতে ভুয়ো পুলিশের স্টিকার লাগিয়ে শঙ্করেরা নিজেদের ক্ষমতার দাপট দেখাতে ব্যবহার করছিলেন।

ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় মামলা, ব্যারাকপুর আদালতে পেশ

বরাহনগর থানা জানিয়েছে, শঙ্কর-সহ ধৃত ছয়জনের বিরুদ্ধে তোলাবাজি, মারধর, জোরপূর্বক সম্পত্তি ছিনতাই এবং যৌন হেনস্থা-সহ ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (BNS)-র একাধিক কঠোর ও জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। আজ শনিবারই ধৃতদের ব্যারাকপুর মহকুমা আদালতে হাজির করে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে পুলিশ।

রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে জনগণের ক্ষোভ কানে না তোলার খেসারত দিতে হচ্ছে বলে দলের অন্দরেই ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ পোর্টাল নিয়ে আক্ষেপ তৈরি হয়েছে, ঠিক অন্যদিকে বরাহনগরের বুকে শাসকদলের নেতার এই ‘দাবাং’ স্টাইলে তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ছাব্বিশের পরিবর্তিত বাংলায় নারী নিরাপত্তা ও অপরাধ দমনে প্রশাসনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মস্ত বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *