বাংলার পালাবদল: পদ্ম শিবিরের বিশাল জয়ের নেপথ্যে কি তবে আরএসএস-এর ‘মাস্টারস্ট্রোক’? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিजेपी) নিরঙ্কুশ জয় রাজ্য রাজনীতির সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে। ২০৭টি আসন নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের এই সাফল্যের নেপথ্যে গেরুয়া শিবিরের তাত্ত্বিক অভিভাবক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ভূমিকাকে অত্যন্ত নির্ণায়ক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। জনসমক্ষে সংঘ সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ না নেওয়ার দাবি করলেও, এবারের নির্বাচনে নিভৃতে তাদের সক্রিয়তা ছিল নজিরবিহীন।
শাখা ও প্রচারকদের নিবিড় নেটওয়ার্ক
গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গে আরএসএস-এর সাংগঠনিক ভিত্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১০ বছর আগে রাজ্যে যেখানে সংঘের শাখার সংখ্যা ছিল প্রায় এক হাজার, বর্তমানে তা সাড়ে চার হাজারে উন্নীত হয়েছে। মূলত এই শাখাগুলোর মাধ্যমেই তৃণমূল স্তরে ভোটারদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। আরএসএস প্রচারকরা নাম উল্লেখ না করে ‘দেশহিত’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা প্রকারান্তরে বিজেপির পক্ষেই গিয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত জেলাগুলোতে ‘সীমান্ত চেতনা মঞ্চ’-এর মতো সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশের ইস্যুগুলো তুলে ধরে ভোটারদের প্রভাবিত করা হয়েছে।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও মেরুকরণের সমীকরণ
নির্বাচনী প্রচারণায় আরএসএস এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলো এবারের নির্বাচনকে ‘বাঙালি হিন্দুদের অস্তিত্বের লড়াই’ হিসেবে তুলে ধরেছিল। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয় যে, রাজনৈতিক পরিবর্তন না এলে হিন্দুদের ভবিষ্যৎ সংকটে পড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, শাসক দলের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়ার (অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি) পাশাপাশি এই তীব্র ধর্মীয় মেরুকরণ বিজেপির জয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জাদ মাহমুদের মতে, আরএসএস অত্যন্ত ধীরগতিতে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা ‘ভদ্রলোক’ সমাজের মনস্তত্ত্বে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ভবিষ্যৎ প্রভাব ও প্রশাসনিক প্রত্যাশা
বিজেপির এই অভাবনীয় জয়ের পর রাজ্য রাজনীতিতে সংঘের প্রভাব আরও সুসংহত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই জয়কে ‘হিন্দুত্বের জয়’ হিসেবে অভিহিত করার পর স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, আগামী দিনে সরকারি নীতি নির্ধারণেও সংঘের আদর্শিক প্রতিফলন ঘটতে পারে। আরএসএস কর্মীরা মনে করছেন, সরকার গঠনের ফলে এখন ভয়মুক্ত পরিবেশে তারা তাদের সাংগঠনিক বিস্তার আরও বাড়াতে পারবেন। তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, এই পরিবর্তনের ফলে রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক মেরুকরণ আরও গভীর হতে পারে। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে আরএসএস-এর এই ‘সফট পাওয়ার’ কৌশলটিই শেষ পর্যন্ত মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে প্রমাণিত হলো।
