বাচ্চার নাক টিকালো করতে সরষের তেল মালিশ করছেন, ডেকে আনছেন অবধারিত মৃত্যুঝুঁকি – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
নবজাতক একটু বোঁচা নাক নিয়ে জন্মালেই পাড়া-পড়শি কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠদের পরামর্শ আসে, ‘সরষের তেল দিয়ে রোজ নাক টেনে দাও, টিকালো হবে।’ যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই পারিবারিক টোটকা বা অন্ধবিশ্বাসকে চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও বিপজ্জনক বলে আখ্যায়িত করছে। রূপ বাড়ানোর এই অন্যায্য চেষ্টায় শিশুর নাক টিকালো হওয়া তো দূরের কথা, বরং কার্টিলেজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং লিপয়েড নিমোনিয়ার মতো প্রাণঘাতী সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।
অন্ধবিশ্বাস বনাম চিকিৎসাবিজ্ঞান
মেডিকেল সায়েন্স অনুযায়ী, শিশুর নাকের আকৃতি কেমন হবে তা শতভাগ নির্ভর করে বাবা-মায়ের ডিএনএ (DNA) বা জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর। জন্মের সময় নবজাতকের নাকের ব্রিজ অত্যন্ত নরম কার্টিলেজ এবং হাড় দিয়ে গঠিত থাকে, যা ১৮ থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত অপরিপক্ব অবস্থায় থাকে। চিকিৎসকদের মতে, এই নরম অংশে চাপ দিয়ে আকৃতি পরিবর্তনের চেষ্টা করা আর কান টেনে লম্বা করার চেষ্টা করা একই রকম অবৈজ্ঞানিক। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মুখের গড়ন পরিবর্তনের ফলে স্বাভাবিকভাবেই নাক শার্প বা সুগঠিত দেখায়, যার পেছনে মালিশের কোনো ভূমিকা নেই।
মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি ও মৃত্যুর ঝুঁকি
এই অবৈজ্ঞানিক অভ্যাসের কারণে শিশুদের শরীরে নানাবিধ জটিলতা দেখা দেয়, যা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
- কার্টিলেজ ড্যামেজ ও হাড়ে চিড়: অতিরিক্ত জোরে নাক টিপলে বা টানলে ভেতরের নরম পর্দা বেঁকে যেতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডিভিয়েটেড নেজাল সেপ্টাম’ বলা হয়। এর ফলে শিশু সারাজীবন নাক বন্ধ, নাক ডাকা ও সাইনাসের সমস্যায় ভুগতে পারে। এমনকি বেশি জোরে টানলে নাকের হাড়ে চিড় (ফ্র্যাকচার) ধরার আশঙ্কা থাকে।
- লিপয়েড নিমোনিয়া ও ইনফেকশন: মালিশের সময় নাকে সরষের তেল, ঘি বা মধু দিলে তা সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে ‘লিপয়েড নিমোনিয়া’ তৈরি করে। এই ধরনের নিমোনিয়া সাধারণ এক্স-রে-তে ধরা পড়ে না, যার ফলে সঠিক চিকিৎসা ব্যাহত হয় এবং অনেক শিশুকে আইসিইউ (ICU) পর্যন্ত নিয়ে যেতে হয়।
- তীব্র শ্বাসকষ্ট: ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুরা মূলত নাক দিয়ে শ্বাস নেয়। মালিশের কারণে নাকের পথ অবরুদ্ধ হলে বা তেল ঢুকলে শিশুরা মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে পারে না। এতে তাৎক্ষণিক শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং ‘সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিন্ড্রোম’ (SIDS) বা আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।
হাসপাতালগুলোর শিশু বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি মাসেই বেশ কিছু শিশু শুধুমাত্র এই নাক মালিশের কারণে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
করণীয় ও বর্জনীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর সুরক্ষায় নাক টেপা, চিমটি কাটা, কিংবা নাকের ভেতর তেল, ঘি, মধু ও কাজল দেওয়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। নাকের ভেতর কোনো কিছু ঢুকিয়ে পরিষ্কার করার চেষ্টাও করা যাবে না। এর পরিবর্তে স্নানের পর নরম তোয়ালে দিয়ে নাকের বাইরের অংশ আলতো করে মুছে দেওয়া এবং সর্দি বা নাক বন্ধের সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্যালাইন নেজাল ড্রপ ব্যবহার করা উচিত। নাক টেপার পর যদি শিশু খেতে না চায়, শ্বাসকষ্ট হয় কিংবা নাক দিয়ে রক্ত বা পুঁজ আসে, তবে তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। অবৈজ্ঞানিক টোটকার চেয়ে শিশুর সুস্থভাবে শ্বাস নিতে পারাটাই আসল সৌন্দর্য।
