রবীন্দ্রকবিতায় ক্ষোভ উগরে কালীঘাটের দোরগোড়ায় মমতাকে বিদ্ধ করলেন শোভনদেব – এবেলা

রবীন্দ্রকবিতায় ক্ষোভ উগরে কালীঘাটের দোরগোড়ায় মমতাকে বিদ্ধ করলেন শোভনদেব – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষস্তরের কোন্দল এবার এক নজিরবিহীন ও কাব্যিক মোড় নিল। দলের প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলবদলের জল্পনা ও ‘বিদ্রোহী’ মনোভাব নিয়ে যখন রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়, ঠিক তখনই বিতর্কের আগুনে ঘৃতাহুতি দিলেন বিদ্যুৎ মন্ত্রী তথা বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। কালীঘাটে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে প্রবেশের মুখে সুদীপ প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কোনও চড়া রাজনৈতিক আক্রমণ নয়, বরং কবিগুরুর কবিতার লাইনে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে এক সুগভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন তিনি।

তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের বিজেপির দিকে পা বাড়ানোর গুঞ্জন এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গতিবিধি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যখন জোর চর্চা চলছে, ঠিক সেই আবহে কালীঘাটের যান শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। সেখানে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতার লাইন আওড়ান। রুদ্ধ কণ্ঠে সাংবাদিকদের সামনে তিনি আবৃত্তি করেন, “কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা, অমাবস্যার কারা লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে, তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে…”। এরপর হঠাৎই কিছুটা থমকে দাঁড়িয়ে, কবিতার শেষ লাইনের মোড়কে সরাসরি সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে— “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?”

তীব্র কটাক্ষ কুণাল-সৌগতর

শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় যখন কবিতার আশ্রয়ে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, তখন দলের অন্য দুই শীর্ষ নেতা কুণাল ঘোষ ও সৌগত রায় সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখিয়েছেন। বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ সুদীপ ও তাঁর স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, উনি একাধিক বার দল পরিবর্তন করেছেন এবং এই বয়সে এসে এমনটা করা অবাঞ্ছিত। সুদীপের দলবদলের জল্পনাকে বিঁধে কুণাল মন্তব্য করেন, ওঁর যাওয়া মানে ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি’। একজন পরচুলওয়ালা লোকের সঙ্গে ভ্রাম্যমান বিউটি পার্লার পাওয়া যাবে। এর পাশাপাশি তিনি পুরনো প্রসঙ্গ টেনে এনে তাপস রায়ের কথাও মনে করিয়ে দেন। অন্যদিকে, বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায় কিছুটা অসহায়তা প্রকাশ করে জানান যে, তিন-চার দিন আগেই সুদীপ বলেছিলেন কোথাও যাচ্ছেন না, এখন তিনি চলে গেলে সৌগতবাবু কী করবেন।

গভীর ক্ষোভ ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের এই রবীন্দ্রকাব্যের অবতারণা দলীয় শৃঙ্খলার গণ্ডিতে থেকে এক চরম প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। কোনো কড়া বা অশালীন ভাষা ব্যবহার না করেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দলের চরম দুঃসময়ে যাঁরা পিছন থেকে ছুরি মারছেন বা সুযোগসন্ধানী রাজনীতি করছেন, তাঁদের প্রতি দলনেত্রী কেন বারবার নমনীয় মনোভাব দেখাবেন। এই চোরা ক্ষোভই প্রবীণ নেতার কণ্ঠে এক গভীর প্রশ্ন হয়ে আছড়ে পড়েছে কালীঘাটের দোরগোড়ায়।

তৃণমূলের অন্দরে এই সুদীপ-বিতর্ক এবং শোভনদেবের মতো প্রবীণ ও অনুগত নেতার এমন প্রকাশ্য ক্ষোভপ্রকাশ দলের অভ্যন্তরীণ ফাটলকেই স্পষ্ট করে তুলছে। একদিকে কুণাল ঘোষের মতো নেতাদের চাঁছাছোলা আক্রমণ আর অন্যদিকে শোভনদেবের মতো প্রবীণদের নীতিগত প্রশ্ন তোলার এই জোড়া ধাক্কা তৃণমূলের অন্দরে বড়সড় রদবদল বা শৃঙ্খলাভঙ্গের মতো পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা আগামী দিনে দলের সাংগঠনিক ঐক্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *