লিপুলেখ গিরিপথ কি নেপালের অংশ, ভারতসহ তিন দেশের সঙ্গে আলোচনা চান নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
বিতর্কিত লিপুলেখ গিরিপথ, লিম্পিয়াধুরা এবং কালাজল ভূখণ্ডের মালিকানা নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাইছে নেপাল। এই সংকট নিরসনে কেবল ভারত নয়, বরং চিন এবং ব্রিটেনের সঙ্গেও চতুর্মুখী কূটনৈতিক আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। রবিবার নেপালের পার্লামেন্টে বিরোধী সাংসদদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র এই বড় সিদ্ধান্তের কথা জানান।
নেপালের সরকারি মানচিত্রে কালী নদীর পূর্ব দিকে অবস্থিত লিপুলেখ, লিম্পিয়াধুরা এবং পূর্ব কালাজলকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই যুক্তিতে এর আগে ভারত সরকারকে ওই বিতর্কিত অংশে কোনো রকম রাস্তা নির্মাণ, সম্প্রসারণ বা সীমান্ত বাণিজ্য না করার আর্জি জানিয়েছিল কাঠমান্ডু। একই সঙ্গে বিতর্কিত এই এলাকাগুলো যে নেপালের নিজস্ব ভূখণ্ড, তা আনুষ্ঠানিকভাবে চিনকেও জানানো হয়েছিল। ২০২০ সালে নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির জমানায় প্রকাশিত ‘নতুন মানচিত্রে’ এই তিনটি অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করার পর থেকেই নয়াদিল্লি ও কাঠমান্ডুর মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়।
ঐতিহাসিক চুক্তির জটিলতা ও ভিন্ন মতবাদ
এই সীমান্ত বিতর্কের মূল উৎস লুকিয়ে রয়েছে দুই শতাব্দী প্রাচীন এক ঐতিহাসিক চুক্তির মধ্যে। ১৮১৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘সুগৌলি চুক্তি’ অনুযায়ী, কালী নদীকে ভারত ও নেপালের মধ্যে ভৌগোলিক সীমারেখা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। নেপালের দাবি, লিপুলেখের উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত লিম্পিয়াধুরাই হলো এই নদীর প্রকৃত উৎসস্থল, যার ফলে পুরো এলাকাটি তাদের সীমান্তের ভেতরে পড়ে। এই ঐতিহাসিক দলিলের সত্যতা নিশ্চিত করতেই মূলত বর্তমান নেপাল সরকার ব্রিটেনের সঙ্গেও কথা বলতে আগ্রহী।
অন্যদিকে, ভারতের অবস্থান এই দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত। নয়াদিল্লির যুক্তি অনুযায়ী, কালী নদীর উৎপত্তিস্থল মূলত কালাজল গ্রামের একটি প্রস্রবণ, যা ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের সীমানার অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া ১৯executable৫৪ সাল থেকেই লিপুলেখ পাস ব্যবহার করে ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য চলে আসছে। দীর্ঘ সাড়ে ছয় দশক ধরে সচল থাকার পর ২০২০ সালে কোভিডের কারণে এই বাণিজ্য সাময়িকভাবে স্থগিত হয়।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ স্বীকার করেছেন যে দুই দেশের পক্ষ থেকেই ভূখণ্ড সংক্রান্ত পাল্টাপাল্টি দাবি রয়েছে। তবে এই জটিলতা নিরসনে ইতিমধ্যে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক স্তরে যোগাযোগ করা হয়েছে। সংকট সমাধানে দুই দেশের সরকার ইতিহাসবিদ, ভূমি জরিপকারী এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি যৌথ দল গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যারা বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে সীমানা নির্ধারণে কাজ করবে।
যেহেতু লিপুলেখ গিরিপথটি ভারত ও চিন—দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রুট, তাই এই আলোচনায় বেইজিংকে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। এই ত্রিপক্ষীয় ও ঐতিহাসিক অংশীদারদের সমন্বয়ে প্রস্তাবিত আলোচনা যদি সফল হয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের একটি সীমান্ত উত্তেজনার অবসান ঘটতে পারে। অন্যথায়, এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
