শান্তির খোঁজে কর্পোরেট দাসত্ব ত্যাগ, জাপানে এখন বৌদ্ধ ভিক্ষু হওয়ার হিড়িক! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
বিশ্বের দরবারে জাপান মানেই উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক জীবনধারা আর সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক সমাজ। বহু দেশের তরুণ-তরুণীর কাছে জাপানে কর্মজীবন কাটানো একটি স্বপ্ন। কিন্তু সেই ‘সূর্যোদয়ের দেশে’ই এখন উল্টো পুরাণ। সেখানকার কর্পোরেট সংস্কৃতির ভয়ঙ্কর চাপ সহ্য করতে না পেরে দলে দলে মানুষ চাকরি ছাড়ছেন। জীবনের সুখ ও শান্তির খোঁজে বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে তাঁরা বেছে নিচ্ছেন বৌদ্ধ ভিক্ষুর কঠোর ও শান্ত জীবন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
কর্পোরেট সংস্কৃতির অন্ধকার দিক ও ‘কারোশি’
জাপানের কর্মসংস্কৃতি অত্যন্ত কঠিন ও নিয়মাবদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশকে অর্থনৈতিকভাবে পুনর্গঠন করতে আজীবন এক সংস্থায় কাজ করার রেওয়াজ চালু হয়েছিল। এখানকার কর্মীদের ‘স্যালারিম্যান’ বলা হয়। দৈনিক নির্দিষ্ট আট ঘণ্টা কাজের পরেও এখানে অতিরিক্ত সময় কাজ করা বাধ্যতামূলক, যার জন্য কোনো বাড়তি বেতনও মেলে না। শুধু তাই নয়, কাজের পর বসের মন জুগিয়ে চলা এবং সহকর্মীদের সাথে নৈশভোজে গিয়ে মদ্যপান করার সামাজিক চাপও কর্মীদের নিতে হয়। অতিরিক্ত কাজের এই মানসিক ও শারীরিক চাপের কারণে স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা জাপানে এতটাই নিয়মিত যে, একে জাজল ভাষায় ‘কারোশি’ বলা হয়।
সফলতার মোহভঙ্গ ও ‘সুকুবা’র পথ
কাজের এই দমবন্ধ পরিবেশের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক বড়সড় মানসিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পদোন্নতি, বেতনবৃদ্ধি বা বোনাসের মতো বৈষয়িক লোভ এখন আর জাজল কর্মীদের টানছে না। অনেকেই এখন ঘড়ির কাঁটা ধরে ন্যূনতম কাজটুকু করে অফিস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।
চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ এখন বেছে নিচ্ছেন ‘সুকুবা’ বা সাময়িক সন্ন্যাসজীবন। জাপানের বৌদ্ধ মঠগুলি সাধারণ মানুষের জন্য স্বল্পমেয়াদি সন্ন্যাস কর্মসূচির সুবিধা দিচ্ছে। কর্মক্ষেত্রের ক্লান্তি দূর করতে অনেকে ছুটি নিয়ে মঠে চলে যাচ্ছেন। সেখানে আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় নেশা অর্থাৎ মোবাইল ফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দীর্ঘ সময় নীরবতা পালন, ধ্যান, ধর্মালোচনা এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানোর মাধ্যমে তাঁরা হারিয়ে যাওয়া মানসিক শান্তি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ভবিষ্যৎ প্রভাব
বহু জাজল কর্মী এখন সাময়িক শান্তি নয়, বরং স্থায়ীভাবে কর্পোরেট জীবনকে বিদায় জানিয়ে পুরোপুরি বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে যাচ্ছেন। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ যে মানুষের মনের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে, জাপানের এই বর্তমান পরিস্থিতি তারই বড় প্রমাণ। এই প্রবণতা বজায় থাকলে আগামী দিনে জাপানের শ্রমবাজারে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি হতে পারে, যা দেশটির অর্থনৈতিক গতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওড়িশা বা অন্যান্য দেশের মতো অর্থনৈতিক ইঁদুরদৌড় ছেড়ে জাজলরা এখন প্রযুক্তি নয়, প্রশান্তিকে সঙ্গী করেই বাঁচতে চাইছেন।
