কলকাতা ছাড়ছে স্টেট ব্যাঙ্কের তিন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ, বাঙালির কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
শিল্প ও বিনিয়োগের জোয়ার এনে রাজ্যে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য যখন সরকারের তরফে নানামুখী প্রচেষ্টা চলছে, ঠিক তখনই কলকাতার বুকে বড়সড় ধাক্কা দিল দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (SBI)। কলকাতা থেকে একের পর এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় পরিষেবা বিভাগ পশ্চিমবঙ্গের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেছে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। ব্যাঙ্কের কর্মী সংগঠনগুলির অভিযোগ, চেক ক্লিয়ারিং থেকে শুরু করে অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ও প্রবীণ নাগরিকদের পেনশন সংক্রান্ত একাধিক প্রধান বিভাগ ভিন রাজ্যে স্থানান্তরিত করার ব্লু-প্রিন্ট ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। এর ফলে রাজ্যে স্টেট ব্যাঙ্কের কর্মী-পদ যেমন একধাক্কায় বিপুল পরিমাণ কমে যাবে, তেমনই পূর্ব ভারতের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বও মারাত্মকভাবে থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে দেশজুড়ে স্টেট ব্যাঙ্কের ১৪টি চেক ক্লিয়ারিং সেল (CCPC) ইউনিট সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে কলকাতা ইউনিটটি পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম এবং আন্দামান-নিকোবরের চেক ক্লিয়ারিংয়ের মূল দায়িত্ব সামলায়। এই সেন্টারে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২২ হাজার ইনওয়ার্ড চেক প্রসেস হয়, যা কার্যক্ষমতার দিক থেকে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এত বিপুল পরিমাণ কাজ হওয়া সত্ত্বেও পূর্বাঞ্চলের জন্য আলাদা কোনও স্বাধীন পরিকাঠামো না বানিয়ে কলকাতা ও গুয়াহাটির এই ইউনিটকে দিল্লির ‘নর্দার্ন গ্রিডের’ সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যেই পাটনা ও ভুবনেশ্বরের কাজ অন্য রাজ্যে সরানো হয়েছে। কলকাতা থেকেও এই পরিষেবা সরলে পূর্বাঞ্চলে আর কোনও নিজস্ব চেক ক্লিয়ারিং সেন্টারই থাকবে না। এর ফলে গ্রাহক পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের চেক যাচাইয়ের সময় আঞ্চলিক ভাষায় বা বাংলায় যোগাযোগের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
রাজস্বের বিপুল ক্ষতি ও বদলির খাঁড়া
কলকাতাকে বঞ্চিত করার এই ধারা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে কলকাতার বিদেশি মুদ্রা বিভাগ বা GMU-এর কাজ মুম্বইয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যার জেরে প্রায় ১৫০ কর্মী উদ্বৃত্ত হয়ে পড়েন এবং বহু আউটসোর্স কর্মী ও ভেন্ডর কাজ হারান। একটি মাত্র বিভাগ মুম্বইয়ে চলে যাওয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রায় ২৫ কোটি টাকার জিএসটি (GST) রাজস্ব হারিয়েছে। এবার নতুন করে কলকাতার অ্যাকাউন্ট ওপেনিং সেল (LCPC) এবং পেনশন প্রসেসিং সেন্টার (CPPC)-কেও ভিন রাজ্যে সরানোর ছক কষছে কর্তৃপক্ষ। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩৫০ জন স্থায়ী কর্মীকে দূরবর্তী রাজ্যে বদলি হতে হবে, যার মধ্যে বহু মহিলা ও প্রতিবন্ধী কর্মী রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই, এর ফলে ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে ব্যাঙ্ক নিয়োগের কোটা হু হু করে কমে যাবে এবং রাজ্য আরও বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাবে।
স্বাধীন পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিডের দাবি
এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে সরব হয়ে ব্যাঙ্ক কর্মীরা দাবি তুলেছেন, কলকাতাকে দিল্লির অধীনে না পাঠিয়ে একেই পূর্বাঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন গ্রিড হিসেবে গড়ে তোলা হোক। কর্মক্ষমতার দিক থেকে শীর্ষে থাকা কলকাতাকে গ্রিড ঘোষণা করা হলে প্রায় ১৫০ স্থায়ী কর্মী, ১০০-র বেশি আউটসোর্স কর্মী এবং দেড়শোরও বেশি ভেন্ডর সরাসরি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে রাজ্য সরকারও তার ন্যায্য জিএসটি রাজস্ব ফিরে পাবে। এই পরিস্থিতিতে কলকাতার অর্থনৈতিক অধিকার ও কর্মসংস্থান বজায় রাখতে রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় স্তরে কোনও কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার।
