তৃণমূলের ভাঙনে এবার সামনে এল দাক্ষিণাত্যের চাণক্য, রমেশের চাঞ্চল্যকর দাবিতে শোরগোল! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে চলমান নজিরবিহীন বিদ্রোহ এবং দল ভাঙার নেপথ্যে কে রয়েছেন, তা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে জল্পনা তুঙ্গে। এতদিন এই ‘অপারেশন তৃণমূল’-এর মূল কারিগর হিসেবে বিজেপির ঝাড়খণ্ডের সাংসদ নিশিকান্ত দুবে কিংবা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের নাম শোনা যাচ্ছিল। বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের দলবদল করাতে নিশিকান্ত দুবে অর্থের জোগান দিচ্ছিলেন বলে সরাসরি অভিযোগ তোলেন তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ। তবে সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে এবার এক নতুন নাম সামনে এসেছে, যা বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের ৬১ বছর বয়সী বিজেপি সাংসদ সিএম রমেশ দাবি করেছেন, তৃণমূলের এই মহাধসের নেপথ্যে আসল ভূমিকা তাঁরই।
পেশায় ব্যবসায়ী এই তেলুগুভাষী বিজেপি সাংসদের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেসের অধিকাংশ বিদ্রোহী সাংসদকে তিনিই নিজে ফোন করে রাজি করিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, মানুষকে প্রভাবিত করার এক বিশেষ দক্ষতা তাঁর রয়েছে এবং মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যেকোনো দলের সাংসদকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ানোর ক্ষমতা তিনি রাখেন। রমেশের দাবি অনুযায়ী, এই পুরো অভিযানের দায়িত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী থাকলেও, সাংসদদের সঙ্গে মূল সমন্বয় রক্ষার কাজটি তিনিই করেছেন। সংসদের ক্যান্টিনে নিয়মিত যাতায়াত এবং বিগত কয়েক বছরের ব্যক্তিগত সখ্যতাকে কাজে লাগিয়েই তিনি এই ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছেন। এমনকি ২০২০ সালে তাঁর ছেলের বিয়েতে দুবাই ও হায়দরাবাদের অনুষ্ঠানে ভিন্নমতাবলম্বী সাংসদদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি, যেখানে বর্তমান বিদ্রোহী শিবিরের অন্যতম মুখ শতাব্দী রায়ও উপস্থিত ছিলেন।
অর্থের লেনদেন নয়, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি
তৃণমূলের ১৯ জন লোকসভা এবং ৩ জন রাজ্যসভা সাংসদের এই আকস্মিক বিদ্রোহের নেপথ্যে কোনো আর্থিক লেনদেনের বিষয়কে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন সিএম রমেশ। তাঁর দাবি, বিদ্রোহী সাংসদদের কোনো টাকা বা পদের টোপ দেওয়া হয়নি। বদলে তাঁদের দুটি বিষয়ের লিখিত নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, তাঁদের নিজস্ব সংসদীয় এলাকার দেখভাল করা হবে এবং দ্বিতীয়ত, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বয়ে সেখানে সর্বাধিক উন্নয়নমূলক কাজ করা হবে, যাতে সাধারণ ভোটাররা অসন্তুষ্ট না হন। এই চুক্তির ভিত্তিতেই সাংসদেরা তৃণমূল থেকে নিজেদের আলাদা করার কাগজে স্বাক্ষর করেছেন বলে তিনি জানান।
মহুয়া মৈত্রের কটাক্ষ ও রমেশের অতীত রেকর্ড
সিএম রমেশের এই বিস্ফোরক দাবিকে অবশ্য নিছক ‘আসফালন’ ও ‘আত্মম্ভরিতা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। রমেশকে ব্যক্তিগত বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেও মহুয়া মৈত্র কটাক্ষের সুরে বলেন, বাংলার রাজনীতিতে এখন একটি ‘কেক’ তৈরি হচ্ছে এবং রমেশ সেখানে কেবল একটি ‘কিসমিস’ যোগ করে নিজের রাজনৈতিক উপযোগিতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তাঁর কাছে দল ভাঙার কোনো উপকরণ নেই।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ রমেশের এই দাবিকে হালকাভাবে নিতে নারাজ, কারণ দল ভাঙানোর ক্ষেত্রে তাঁর অতীত রেকর্ড বেশ পোক্ত। ২০১৯ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপি যখন জগন রেড্ডির কাছে ক্ষমতা হারায়, তখন মাত্র এক মাসের মধ্যে টিডিপির ছয়জন সাংসদের মধ্যে চারজনকে বিজেপিতে শামিল করিয়েছিলেন এই সিএম রমেশই।
নেপথ্য তৎপরতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
ভেতরের খবর, সম্প্রতি সংবিধান ক্লাবের নির্বাচনে ঝাড়খণ্ডের সাংসদ নিশিকান্ত দুবের সঙ্গে রমেশের সাক্ষাৎ হয় এবং সেখান থেকেই এই প্রক্রিয়ার গতি বাড়ে। তৃণমূলের এক রাজ্যসভা সাংসদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সিএম রমেশ প্রথম থেকেই দলের কয়েকজন সাংসদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। এমনকি সায়নী ঘোষের মতো মমতার ঘনিষ্ঠ সাংসদদের সই করানোর পেছনেও তাঁর ভূমিকা ছিল। গত ৮ জুন দিল্লিতে যখন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক চলছিল, ঠিক তখনই কলকাতায় শতাব্দী রায়ের বাড়িতে আয়োজিত এক নৈশভোজে সিএম রমেশের সঙ্গে বিদ্রোহী সাংসদদের গোপন বৈঠকটি চূড়ান্ত রূপ পায়।
তৃণমূলের এই বিশাল অংশের বিদ্রোহের ফলে লোকসভা ও রাজ্যসভায় দলটির শক্তি এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে গেল। এই ভাঙন যদি আইনি স্বীকৃতি পায়, তবে জাতীয় রাজনীতিতে মমতার দলের দর কষাকষির ক্ষমতা যেমন হ্রাস পাবে, তেমনই পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন দিন দিনগুলোতে বিজেপির হাত আরও শক্ত হবে, যা বাংলার শাসক দলের জন্য এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করল।
