দামে ছাড় নেই, অথচ পণ্যে ছোট! কেন আপনার পকেট কাটছে কো ম্পা নিগুলো?

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় টালমাটাল বাজার: সাধারণের পকেটে টান ও অর্থনীতির নতুন সংকট
বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৪ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ভারতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিচ্ছে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ইওয়াই ইন্ডিয়ার (EY India) করা সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার আঁচ আগামী দুই বছর পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে। তেলের দাম বৃদ্ধির এই প্রভাব কেবল পেট্রোল-ডিজেলের পাম্পেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দেশের সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন খরচকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
খাদ্য ও নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা
ভারত তার মোট চাহিদার প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোজ্য তেল আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় পাম, সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেলের দাম বর্তমানে ৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সরাসরি প্রভাব পড়েছে এফএমসিজি (FMCG) বা দ্রুত ভোগ্যপণ্যের বাজারে। সাবান, শ্যাম্পু ও বিস্কুট প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলো কাঁচামালের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান পরিবহন খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতির কারণে দেশীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সহজলভ্যতা ও দাম নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
শ্রিঙ্কফ্লেশন: দাম একই রেখে পণ্যের পরিমাণে কাটছাঁট
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে অনেক কো ম্পা নি বর্তমানে ‘শ্রিঙ্কফ্লেশন’ (Shrinkflation) কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। এই পদ্ধতিতে পণ্যের মূল দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও প্যাকেটের ভেতরের ওজনে কমতি করা হচ্ছে। গ্রাহকরা তাৎক্ষণিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি ধরতে না পারলেও পরোক্ষভাবে তারা একই দামে কম পরিমাণ পণ্য কিনছেন, যা মূলত মুদ্রাস্ফীতিরই একটি অদৃশ্য রূপ।
এসি ও হোম অ্যাপ্লায়েন্সের দরে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা
গ্রীষ্মের প্রাক্কালে এসি, ফ্রিজ এবং ওয়াশিং মেশিনের চাহিদা এবং উৎপাদন খরচ উভয়ই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বর্তমানে গৃহস্থালির এই পণ্যগুলোর উৎপাদন খরচ প্রায় ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যার দায়ভার এসে পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। চাহিদাজনিত কারণে ভোল্টাস বা ব্লু স্টারের মতো কো ম্পা নির শেয়ার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব থাকলেও, সামগ্রিক কাঁচামালের সংকট সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ঘরোয়া ইলেকট্রনিক্স পণ্য কেনা আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে।
বস্ত্র ও ওষুধ শিল্পে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
ভারতের বিশাল বস্ত্র শিল্প তার চাহিদার ৬০ শতাংশই সিন্থেটিক ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুর মাধ্যমে মেটায়, যার প্রধান উৎস হলো অপরিশোধিত তেল। কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের দাম ৫০ শতাংশ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক ও রঙয়ের দাম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ইওয়াই-এর পূর্বাভাস অনুয়ায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের মধ্যে পোশাক এবং পেইন্টের দাম ২-৫ শতাংশ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একইসঙ্গে ওষুধের কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও জটিল সাপ্লাই চেইন ভারতের স্বাস্থ্য খাতেও নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এক ঝলকে
- অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৪ ডলার ছাড়ানোয় অর্থনীতিতে অস্থিরতা।
- ভোজ্য তেলের দাম ইতিমধ্যে ৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
- পণ্যের দাম না বাড়িয়ে ওজন কমানোর কৌশল বা ‘শ্রিঙ্কফ্লেশন’-এর প্রবণতা বৃদ্ধি।
- এসি, ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিনের উৎপাদন খরচ ১০-১৫ শতাংশ বেড়েছে।
- আগামী দিনে পোশাক ও পেইন্টের দাম ২-৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা।
- ওষুধের দামের পাশাপাশি জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি।
