ব্যাগের বোঝা পড়ুয়ার দেহের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি নয়, স্কুলশিক্ষা দপ্তরের নজিরবিহীন নির্দেশিকা – এবেলা

ব্যাগের বোঝা পড়ুয়ার দেহের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি নয়, স্কুলশিক্ষা দপ্তরের নজিরবিহীন নির্দেশিকা – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

স্কুল ছুটির পর পিঠে বইয়ের বিশাল বোঝা নিয়ে খুদে পড়ুয়াদের কুঁজো হয়ে হেঁটে চলা কিংবা সন্তানদের কষ্ট দেখে বাবা-মায়েদের সেই ভারী ব্যাগ কাঁধে তুলে নেওয়া— রাজ্যের রাস্তাঘাটে এই দৃশ্য অত্যন্ত পরিচিত। তবে খুদে পড়ুয়াদের এই শারীরিক ধকল ও কষ্ট দূর করতে এবার বড়সড় ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শুক্রবার রাজ্য স্কুলশিক্ষা দপ্তরের তরফে একটি কড়া নির্দেশিকা জারি করে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো পড়ুয়ার স্কুলের ব্যাগের ওজন তার শরীরের মোট ওজনের ১০ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

কেন্দ্রের শিক্ষানীতি মেনে নতুন নির্দেশিকা

২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘স্কুল ব্যাগ পলিসি’ (School Bag Policy)-র ওপর ভিত্তি করেই পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত সরকার এই নির্দেশিকা কার্যকর করেছে। ২০২০ সালে তত্কালীন রাজ্য সরকারও একটি নির্দেশিকা এনেছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এবার তা কঠোরভাবে বলবৎ করতে কোমর বেঁধে নেমেছে বর্তমান শিক্ষাদপ্তর। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার স্বাস্থ্য সমীক্ষা ও প্রস্তাবকে মান্যতা দিয়েই এই ১০ শতাংশের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রাক্-প্রাথমিক (Pre-Primary) স্তরের শিশুদের জন্য কোনো স্কুল ব্যাগ না রাখারই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অতিরিক্ত ওজনের কুফল নিয়ে সচেতনতা

ভারী ব্যাগের কারণে শিশুদের শরীরে কী কী দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হচ্ছে, তা এই নির্দেশিকায় বিশদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

  • পেশিতে চাপ: অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগ পিঠে ঝোলানোর কারণে শিশুদের শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে যায়, যার ফলে ঘাড়, পিঠ এবং কাঁধের পেশিতে তীব্র চাপ পড়ে।
  • শারীরিক গঠনে বিকৃতি: বাড়ন্ত বয়সে প্রতিদিন এই ধরনের ভারী বোঝা বহনের ফলে শিশুদের স্বাভাবিক দেহ গঠনে (Posture) নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং হাড়ের ক্ষতি হয়।
  • ক্রনিক ব্যথা: খুব ছোট বয়স থেকেই কাঁধ ও পিঠে ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সমস্যায় ভুগতে শুরু করে শিশুরা।

শ্রেণিভিত্তিক ব্যাগের ওজন এবং ওজন মাপার যন্ত্র

প্রাক্-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের গড় ওজন অনুযায়ী ব্যাগের সর্বোচ্চ সীমা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে বিকাশ ভবন:

  • প্রথম শ্রেণি: পড়ুয়াদের গড় দেহের ওজন ১০-১৬ কেজি হলে, ব্যাগের ওজন কোনোভাবেই ২.২ কেজি (২২০০ গ্রাম) ছাড়াতে পারবে না।
  • দ্বাদশ শ্রেণি: পড়ুয়াদের গড় দেহের ওজন ৩৫-৫০ কেজি হলে, ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন হবে ৩.৫ থেকে ৫ কেজি। এটিই স্কুলস্তরের সর্বোচ্চ সীমা।

এই নিয়ম সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে প্রতিদিন স্কুলগুলোতে পড়ুয়াদের ব্যাগের ওজন পরিমাপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই কারণে প্রতিটি সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে ওজন মাপার যন্ত্র (Weighing Machine) রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিকাশ ভবনে খরচ কমানোর কড়া বার্তা

অন্যান্য সরকারি দপ্তরের পথ অনুসরণ করে বৃহস্পতিবারই বিকাশ ভবনের (শিক্ষাদপ্তর) কর্মী ও আধিকারিকদের সরকারি সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে চরম সাবধানী ও মিতব্যয়ী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খরচ ও অপচয় কমানোর জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে:

  • কোন আধিকারিক বা কর্মী সপ্তাহে কবে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করবেন, তা নির্দিষ্ট দিন অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
  • শারীরিক উপস্থিতির বদলে ভিডিও কনফারেন্সিং (Video Conference)-এর মাধ্যমে সমস্ত প্রশাসনিক বৈঠক সারতে বলা হয়েছে।
  • অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত, কাগজের অপচয় রুখতে জেরক্স বা ফটো কপি এবং প্রিন্ট আউট করার ক্ষেত্রে কড়া রাশ টানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এক ঝলকে

  • পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা দপ্তরের নির্দেশিকা অনুযায়ী, পড়ুয়াদের স্কুলের ব্যাগের ওজন তাদের শরীরের ওজনের ১০%-এর বেশি হতে পারবে না।
  • প্রাক্-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের জন্য কোনো স্কুল ব্যাগ থাকবে না; প্রথম শ্রেণির ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন ২.২ কেজি এবং দ্বাদশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ কেজি।
  • নিয়ম মানা হচ্ছে কি না দেখতে প্রতিটি সরকারি স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে ওজন মাপার যন্ত্র রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  • পাশাপাশি বিকাশ ভবনের খরচ কমাতে আধিকারিকদের বাড়ি থেকে কাজের দিন নির্ধারণ ও ভিডিও কনফারেন্সে বৈঠকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *