ভাঙনের মুখে জোড়াফুল, হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বামেরা কি পাবে নতুন মুখ? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ব্যালট বাক্সে নজিরবিহীন প্রত্যাখ্যানের পর এক চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দল রক্ষা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এমন মহাসংকট দলটির ইতিহাসে আর কখনো আসেনি। ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রবল ইন্দিরা হাওয়ায় জয়ী হয়ে রাজনীতিতে চমকপ্রদ আবির্ভাব ঘটেছিল যাঁর, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে পরাজয় এবং দলকে ক্ষমতায় ফেরাতে না পারা এক অভাবনীয় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় দলের সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিলেন, তৃণমূলের অনাচার ও নৈরাজ্য থেকে মানুষের মুক্তি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কারণে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি যেন আজ দলের জন্য এক বড় বোঝা হয়ে উঠেছেন।
তৃণমূলের অভ্যন্তরে মহা-ভাঙনের সংকেত
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক রণকৌশল, বিশেষ করে বাম ও কংগ্রেসের মতো ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে পরিকল্পিতভাবে নিকেশ করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি, দল ও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গড়ে ওঠা দুর্নীতির কাঠামো দলটিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই বিপর্যয়ের জেরে তৃণমূলের রাজ্য ও জেলা স্তরের একাংশ দুর্নীতিগ্রস্ত ও ক্ষমতা লোভী নেতা, সাংসদ এবং বিধায়করা ইতিমধ্যেই বিজেপির দিকে পা বাড়াতে শুরু করেছেন। এলাকা স্তরে নানা অপকর্মে জড়িত অন্য একদল কর্মী সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলেও বছর শেষের পুরভোট এবং ২০২৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে বিজেপির পতাকা হাতে তুলে নেওয়ার জন্য আশ্রয় খুঁজছেন। বঙ্গ রাজনীতিতে দলবদল আর এই আশ্রয়ের সংস্কৃতি তৃণমূলের হাত ধরেই বিকাশ লাভ করেছে, যাতে পূর্ণ সহযোগিতা রয়েছে বিজেপিরও।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও বামেদের নতুন সম্ভাবনা
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ধরণের বিপর্যয় এর আগে সামলেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭৭ সালের পরবর্তী সময়ে কংগ্রেস ত্যাগের হিড়িক পড়ার পরও তিনি যেভাবে আবার মূল স্রোতে ফিরে এসেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেই চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিপর্যয় সত্ত্বেও এখনও ৪০ শতাংশ ভোট তৃণমূলের ঝুলিতে রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে জনমানসে তাঁদের অবশিষ্টাংশ এখনও টিকে আছে। তবে চলমান সরকারও আগামী দিনে ভুলত্রুটি করবে এবং সেই সুযোগে বিরোধী দলগুলি কীভাবে নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করে, সেটিই দেখার বিষয়।
এই পরিস্থিতিতে বাংলার সাধারণ মানুষের একাংশ এখন বামপন্থীদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ৩৪ বছরের বাম শাসনের ইমারত ভেঙে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তৃণমূলের এই চরম দুর্দিনে সেই হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করতে বামেদেরও এখন সামনের সারিতে একজন লড়াকু এবং বিকল্প নেতৃত্ব প্রয়োজন। আগামী বছরগুলোতে দল অটুট রাখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন কৌশল এবং মাঠপর্যায়ে বামেদের পুনরুত্থানের চেষ্টার ওপরই নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ভবিষ্যৎ সমীকরণ।
