ভারতে প্রথমবার ‘জিহাদি ড্রাগ’ ক্যাপ্টাগন উদ্ধার, আন্তর্জাতিক মাদক সন্ত্রাসবাদের ট্রানজিট রুট হওয়ার ঝুঁকিতে দেশ! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
ভারতে এই প্রথম উদ্ধার হলো আন্তর্জাতিক জঙ্গি ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অত্যন্ত প্রিয় এবং ভয়ঙ্কর ‘জিহাদি ড্রাগ’ বা ক্যাপ্টাগন ট্যাবলেট। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ‘অপারেশন রেজপিল’-এর আওতায় গুজরাতের মুন্দ্রা বন্দর এবং দিল্লির নেব সরাই এলাকায় এক যৌথ অভিযান চালিয়ে মোট ২২৭.৭ কেজি ওজনের এই মাদক বাজেয়াপ্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যার আনুমানিক মূল্য ১৮২ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ মাদকের চালানটি সিরিয়া থেকে আনা হয়েছিল এবং ভারতের মাটিকে ‘ট্রানজিট রুট’ বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে সৌদি আরবসহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাচারের পরিকল্পনা ছিল। এই ঘটনায় এক বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। কন্টেনার এবং চায়ের প্যাকেটের ভেতরে লুকিয়ে এই মাদক পাচার করা হচ্ছিল।
কী এই ক্যাপ্টাগন এবং কেন একে ‘জিহাদি মাদক’ বলা হয়
ক্যাপ্টাগন হলো মূলত ‘ফেনেটিলিন’ নামক একটি কৃত্রিম উদ্দীপক (অ্যাম্ফিটামিন-টাইপ স্টিমুল্যান্ট) রাসায়নিকের প্রচলিত নাম। ১৯৬০-এর দশকে অতিসক্রিয়তা (এডিএইচডি) এবং বিষণ্ণতার মতো রোগের চিকিৎসার জন্য এটি তৈরি করা হলেও, তীব্র আসক্তি ও অপব্যবহারের কারণে ১৯৮০ সালে আন্তর্জাতিকভাবে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। এই ট্যাবলেট শরীরে প্রবেশ করলে স্নায়ুতন্ত্র চরম উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ফলে মুহূর্তের মধ্যে মানুষের ঘুম, খিদে, ক্লান্তি, ভয় এবং যন্ত্রণাবোধ উধাও হয়ে যায়। মাদকাসক্ত ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ক্লান্তি ছাড়াই যেকোনো নৃশংস কাজ করতে পারে, কারণ এটি মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি ও মানবিক অনুভূতি লোপ করে তাকে এক প্রকার রোবট বা যন্ত্রে পরিণত করে। সিরিয়া ও ইরাকের আইএসআইএস (আইসিস)-সহ বিভিন্ন সশস্ত্র চরমপন্থী সংগঠনের যোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়ডরহীনভাবে লড়াই করতে এই মাদক যথেচ্ছ ব্যবহার করে। এই কারণেই বিশ্বজুড়ে এটি ‘জিহাদি ড্রাগ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
উৎপাদন খরচ ও কালোবাজারির অর্থনীতি
তুলনামূলকভাবে কম উৎপাদন খরচের কারণে এই মাদককে ‘গরিবের কোকেন’-ও বলা হয়ে থাকে। সিরিয়া বা লেবাননের প্রত্যন্ত ল্যাবরেটরিগুলোতে প্রতিটি ক্যাপ্টাগন ট্যাবলেট তৈরি করতে খরচ হয় মাত্র কয়েক টাকা। অথচ পশ্চিম এশিয়ার ধনী দেশগুলোতে বা আন্তর্জাতিক কালোবাজারে প্রতিটি ট্যাবলেট ১০ থেকে ২০ ডলারে বিক্রি হয়। এই বিপুল লভ্যাংশের টাকা সরাসরি চলে যায় আন্তর্জাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেট এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর পকেটে, যা দিয়ে তারা পরবর্তীতে আধুনিক অস্ত্র কেনে এবং নিজেদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত ‘নার্কো টেররিজ্ম’ বা মাদক সন্ত্রাসবাদের একটি ভয়াবহ রূপ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সে দেশে কোটি কোটি ক্যাপ্টাগন ট্যাবলেটের মজুত ও অত্যাধুনিক গবেষণাগারের সন্ধান মেলে, যা প্রমাণ করে যে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়াই ছিল এই মাদকচক্রের প্রধান আঁতুড়ঘর।
ভারতের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব ও উদ্বেগ
অতীতে ভারতের পাঞ্জাব, কাশ্মীর, রাজস্থান ও মুম্বাইয়ের মতো এলাকাগুলোতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর মদদে ‘মাদক সন্ত্রাসবাদ’ ছড়ানোর চেষ্টা হলেও প্রশাসনের কঠোরতায় তা বর্তমানে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে সাম্প্রতিক এই ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক চোরাচালানকারীরা এখন ভারতের রাজধানী দিল্লি এবং গুজরাতের সমুদ্র উপকূলকে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারের নতুন করিডোর বা ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। ভারত যদি এই চক্রের মূল ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও যুবসমাজ চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে। যদিও কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ভারতের মাটিতে মাদক পাচারের যেকোনো চেষ্টা রুখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখা হবে।
