রায় পেয়েও কেন মিলছে না বিচার! সুপ্রিম কোর্টের তোপ ও শঙ্কার কারণ কী?

রায় পেয়েও কেন মিলছে না বিচার! সুপ্রিম কোর্টের তোপ ও শঙ্কার কারণ কী?

বিচার ব্যবস্থায় রায়ের পরও দীর্ঘসূত্রতা: উদ্বেগ প্রকাশ সুপ্রিম কোর্টের, দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ

ভারতের বিচার ব্যবস্থায় একটি রায় ঘোষণার অর্থই হলো ন্যায়বিচার প্রাপ্তি। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে রায়ের পরও তা কার্যকর করতে গিয়ে অসহায় হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সম্প্রতি এই ‘এগজিকিউশন পিটিশন’ বা রায় কার্যকর সংক্রান্ত মামলাগুলোর অত্যধিক হার নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। দেশের জেলা আদালতগুলোতে ঝুলে থাকা লক্ষাধিক মামলা বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রায়ের পর অন্তহীন অপেক্ষা: আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ

বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি পঙ্কজ মিথালের ডিভিশন বেঞ্চ এই পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ এবং হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কেবল রায়ের ঘোষণা ন্যায়বিচারের সমাপ্তি নয়, বরং রায়ের সঠিক বাস্তবায়নই হলো ন্যায়বিচারের প্রকৃত প্রতিফলন। বিশেষ করে সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদগুলোতে দেখা গেছে, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরও জয়ী পক্ষকে রায় বাস্তবায়নের জন্য পুনরায় বছরের পর বছর নিম্ন আদালতের দুয়ারে ঘুরতে হচ্ছে। ২০০৬ সালের একটি মামলার উদাহরণ টেনে আদালত জানিয়েছে, রায় পাওয়ার দুই দশক পরেও আবেদনকারী অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকছেন, যা বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার এক জঘন্য উদাহরণ।

পরিসংখ্যানের আয়নায় মামলার জট

দেশের বিচারিক পরিকাঠামোয় এগজিকিউশন মামলার এই স্তূপ সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থাকে মন্থর করে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী পরিস্থিতিটি নিম্নরূপ:

  • জেলা আদালতগুলোতে বর্তমানে ১০ লক্ষেরও বেশি এগজিকিউশন মামলা অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
  • এর মধ্যে প্রায় ৮ লক্ষ মামলা ছয় মাসের বেশি পুরনো, যা বিচার ব্যবস্থার কার্যকর গতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
  • যদিও গত এক বছরে প্রায় ৭.৭ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে, তবুও ঝুলন্ত মামলার বিশাল সংখ্যা চিন্তার কারণ হয়েই থাকছে।

হাই কোর্টগুলোর প্রতি সুপ্রিম কোর্টের কঠোর নির্দেশ

এই মামলার জট কাটাতে সুপ্রিম কোর্ট দেশের প্রতিটি হাই কোর্টকে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বেঞ্চের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো রায়ের বাস্তবায়ন যেন অনির্দিষ্টকাল আটকে না থাকে। প্রতিটি হাই কোর্টকে একটি স্বচ্ছ এবং কার্যকর পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে। বিশেষত, জেলা আদালতগুলোতে ঝুলে থাকা এগজিকিউশন মামলাগুলো যাতে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যায়, তার জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাই কোর্টগুলোকে তাদের অধীনস্থ আদালতগুলোর কার্যক্রম মনিটর করতে বলা হয়েছে।

বিচার ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রভাব

সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া অবস্থান মামলাকারীদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে এই সংস্কারমূলক পদক্ষেপ অপরিহার্য ছিল। মামলার জট খুললে সাধারণ মানুষের আইনের শাসনের প্রতি আস্থা ও সম্মান আরও সুদৃঢ় হবে বলে মনে করছে সচেতন মহল। আগামী ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী শুনানিতে প্রতিটি হাই কোর্টকে তাদের গৃহীত পদক্ষেপের রিপোর্ট পেশ করতে হবে। এই সময়সীমাই মূলত বিচারিক সংস্কারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এক ঝলকে

  • জেলা আদালতে বর্তমানে ১০ লক্ষেরও বেশি এগজিকিউশন পিটিশন ঝুলে আছে।
  • সুপ্রিম কোর্ট বিদ্যমান পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ ও হতাশাজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
  • অমীমাংসিত মামলাগুলো ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।
  • দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য হাই কোর্টদের নিজস্ব গাইডলাইন তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
  • মামলা সংক্রান্ত পরবর্তী শুনানি হবে ৭ অক্টোবর ২০২৬।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *