লাইসেন্সহীন দোকান ভাঙার পরেও হার মানেননি বুড়িমা, জেনে নিন সেই অদম্য লড়াইয়ের কাহিনী!

লাইসেন্সহীন দোকান ভাঙার পরেও হার মানেননি বুড়িমা, জেনে নিন সেই অদম্য লড়াইয়ের কাহিনী!

এবেলা ডেস্কঃ

 

দেশভাগের যন্ত্রণা পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে: অন্নপূর্ণা দাসের ‘বুড়িমা’ ব্র্যান্ডের নেপথ্য কাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদন: বাংলার প্রতিটি কালীপুজোয় যে বাজির ব্র্যান্ডটি বাঙালির আবেগ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে, সেই ‘বুড়িমা’ নামটির নেপথ্যে রয়েছে এক অদম্য নারীর হার না মানা সংগ্রামের গল্প। দেশভাগের ভয়াবহতা থেকে শুরু করে শূন্য হাতে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজের ভাগ্য গড়ার এই লড়াই যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়।

‘বুড়িমা’ ব্র্যান্ডের প্রাণপুরুষ হলেন অন্নপূর্ণা দাস। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরের বাসিন্দা অন্নপূর্ণা ১৯৪৮ সালে দেশভাগের দাঙ্গার জেরে সর্বস্ব হারিয়ে দুই সন্তান নিয়ে এপারে চলে আসতে বাধ্য হন। দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরের শরণার্থী শিবিরে থাকাকালীন সংসারের হাল ধরতে তিনি বিড়ি বাঁধার কাজ শুরু করেন।

পরবর্তীতে বেলুড়ে চলে এসে ১৯৫২ সালে একটি ছোট দোকান দেন তিনি। সেখানে লজেন্স, খেলনা ও পুজোর সামগ্রী বিক্রি করলেও কালীপুজোর মরসুমে তাঁর মাথায় আসে বাজি ব্যবসার ভাবনা। অন্যের কাছ থেকে ধার করে বাজি এনে দোকান সাজালেও শুরুতে বাধা আসে পুলিশের তরফ থেকে। লাইসেন্স না থাকায় পুলিশ তাঁর বাজি বাজেয়াপ্ত করে এবং দোকান গুঁড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই বিপর্যয় তাঁকে দমাতে পারেনি। অন্নপূর্ণা দাস নিজেই আইনি লড়াইয়ে নামেন এবং সমস্ত নিয়ম মেনে বাজি তৈরির সরকারি অনুমতি ও লাইসেন্স সংগ্রহ করেন।

এরপর তিনি বাঁকড়ার অভিজ্ঞ কারিগর আকবর আলির কাছ থেকে বাজি তৈরির খুঁটিনাটি শিখে নেন। তাঁর তৈরি বাজির চাহিদা প্রথম মরসুমেই তুঙ্গে পৌঁছায়। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি ‘বুড়িমা’ নামে পরিচিতি পান এবং সেই নামেই বাজি ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে। উত্তরপাড়া, সালকিয়া ও বড়বাজারের বাজারে ঘুরে ঘুরে বাজির চাহিদা পর্যবেক্ষণ করতেন তিনি। অন্নপূর্ণা দাসের ব্যবসায়িক দূরদর্শিতা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে হাওড়ার গণ্ডি পেরিয়ে ডানকুনি, তালবান্দা এমনকী অন্ধ্রপ্রদেশের শিবকাশীর মতো জায়গায় তাঁর বিশাল কারখানা গড়ে ওঠে।

পরিবেশ রক্ষার্থে শব্দবাজি নিষিদ্ধ হওয়ার পর ব্যবসায় বড় ধাক্কা এলেও হাল ছাড়েননি তাঁর উত্তরসূরিরা। বর্তমানে সংস্থাটি সম্পূর্ণভাবে পরিবেশবান্ধব ‘সবুজ বাজি’র ওপর গুরুত্ব দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৯৫ সালের ৩ জুন অন্নপূর্ণা দাসের জীবনাবসান হলেও, তাঁর রেখে যাওয়া এই ব্র্যান্ড আজও অটুট। আজকের ‘বুড়িমা’ কেবল একটি বাজির নাম নয়, এটি দেশভাগের শরণার্থী জীবন থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এক নারীর স্বনির্ভর হওয়ার ইতিহাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *