১০০ ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ! ফুটবলের আড়ালে দুই দেশের ভয়ংকর সংঘাত – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
ফুটবলকে কেন্দ্র করে সাধারণত খেলোয়াড় বা সমর্থকদের মধ্যেই উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। কিন্তু ইতিহাসে এমন এক সময় এসেছিল যখন ফুটবল মাঠের উত্তেজনা গড়িয়েছিল দুই প্রতিবেশী দেশের রণক্ষেত্রে। ১৯৬৯ সালে ১৯৭০-এর ফুটবল বিশ্বকাপের বাছাই পর্বকে কেন্দ্র করে এল সালভাদোর এবং হন্ডুরাস জড়িয়ে পড়েছিল এক ভয়ংকর সামরিক সংঘাতে। চার দিন ধরে চলা এই সংঘাত ইতিহাসের পাতায় ‘১০০ ঘণ্টার যুদ্ধ’ নামে পরিচিত, যেখানে প্রাণ গিয়েছিল হাজার হাজার নিরীহ মানুষের।
যুদ্ধের নেপথ্যে থাকা আর্থসামাজিক কারণ
আপাতদৃষ্টিতে এই যুদ্ধের সূত্রপাত ফুটবল ম্যাচ থেকে হলেও এর গভীরে ছিল দীর্ঘদিনের আর্থসামাজিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন। প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত এল সালভাদোর আয়তনে ছোট হলেও এর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৬৪ লক্ষ। ত্রুটিপূর্ণ ভূমি নীতি এবং বেকারত্বের কারণে বিপুল সংখ্যক সালভাদোরবাসী কাজের খোঁজে আয়তনে বড় ও কৃষিপ্রধান প্রতিবেশী দেশ হন্ডুরাসে পাড়ি জমান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেকারত্ব ও স্থানীয় নানা সমস্যার জন্য হন্ডুরাসের বাসিন্দারা এই অভিবাসীদের দায়ী করতে শুরু করে। কট্টরপন্থীদের মদতে এবং প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন ইন্ধনে সালভাদোরবাসীদের ওপর অত্যাচার, খুন ও ধর্ষণের মতো ঘটনা বাড়তে থাকে, যার ফলে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে শুরু করেন।
বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব এবং সংঘাতের চরম পরিণতি
এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মাঝেই বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বে মুখোমুখি হয় দুই দেশ। ৮ জুন প্রথম ম্যাচে হন্ডুরাসের সমর্থকরা সালভাদোর দলের হোটেলে হামলা চালায় এবং ম্যাচটিতে হন্ডুরাস জয়ী হয়। ১৫ জুন দ্বিতীয় ম্যাচে সালভাদোরে এর ভয়ংকর প্রতিশোধ নেওয়া হয়। মাঠে হন্ডুরাসের পতাকার বদলে একটি নোংরা কাপড় ওড়ানো হয় এবং সংঘাতের জেরে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। ২১ জুন মেক্সিকোতে আয়োজিত তৃতীয় প্লেঅফ ম্যাচে এল সালভাদোর জয়ী হওয়ার আগেই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে যায়। হন্ডুরাসে থাকা সালভাদোরবাসীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন এবং একটি অসামরিক বিমান গুলি করে নামানোর ঘটনার পর ১৪ জুলাই পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়। ১০০ ঘণ্টার এই ভয়ংকর যুদ্ধে প্রায় তিন লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। সংঘাতে প্রাণ হারান সালভাদোরের প্রায় ৯০০ সাধারণ মানুষ, হন্ডুরাসের ২৫০ সৈন্য এবং ২০০০ সাধারণ নাগরিক। ধ্বংস হয় বহু জনপদ। শেষমেশ যুদ্ধবিরতি হলেও দুই দেশের মধ্যেকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রেশ থেকে গিয়েছিল পরবর্তী কয়েক দশক জুড়ে।
