২০৩৫ সালে মহাকাশে ভারতের রাজত্ব, সঙ্গী রাশিয়া!

মহাকাশ গবেষণায় ইতিহাস গড়ার পথে ভারত: রাশিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে গড়বে নিজস্ব স্পেস স্টেশন
মহাকাশ বিজ্ঞানের দুনিয়ায় ভারত এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন ‘ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন’ বা বিএএস (BAS) নির্মাণ করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (ইসরো)। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার জন্য ভারত তার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মিত্র রাশিয়ার সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের পথে হাঁটছে। সম্প্রতি মস্কোতে আয়োজিত এক মহাকাশ সম্মেলনে ইসরোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এই সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে রাশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে ভারত
ইসরো প্রোপালশন কমপ্লেক্সের পরিচালক এ. পাকিরাজ জানিয়েছেন, মহাকাশ স্টেশন নির্মাণের মতো জটিল কাজে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ভারতের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। মহাকাশ স্টেশনের কন্ট্রোল সিস্টেম, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং ট্র্যাকিংয়ের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ভারতের নিজস্ব মহাকাশ স্টেশনের নকশা রাশিয়ার প্রস্তাবিত নতুন মহাকাশ স্টেশন ‘আরওএস’ (ROS)-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হতে পারে, যা প্রযুক্তিগত আদান-প্রদানকে সহজতর করবে।
মহাকাশে ভারতের অবস্থানের গুরুত্ব
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই মহাকাশ স্টেশনটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হবে এবং এর কক্ষপথের ঝোঁক থাকবে ৫১.৬ ডিগ্রি। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন বা আইএসএস (ISS) ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। এমতাবস্থায় চীনের টিকে থাকা নিজস্ব স্পেস স্টেশনের বিপরীতে ভারতের এই উদ্যোগ বিশ্ব মহাকাশ গবেষণার রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। ভারত কেবল নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক মানচিত্রে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।
কেন রাশিয়া অপরিহার্য অংশীদার?
মহাকাশ স্টেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে রাশিয়ার ঐতিহাসিক সাফল্য ও সক্ষমতা প্রশ্নাতীত। ‘মির’ স্টেশন থেকে শুরু করে বর্তমান আইএসএস-এর রুশ অংশ পরিচালনা—সবক্ষেত্রেই রাশিয়া অনন্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ভারত রাশিয়ার সহযোগিতা নিতে আগ্রহী:
- অর্বিটাল মডিউল তৈরি ও তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
- মহাকাশচারীদের জন্য লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম বা মহাকাশে বেঁচে থাকার উপযোগী পরিবেশ তৈরি।
- উন্নত ডকিং সিস্টেম, যা মহাকাশযানগুলোকে সফলভাবে স্টেশনের সাথে যুক্ত হতে সাহায্য করবে।
ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
ভারত ও রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণার এই সম্পর্ক গত কয়েক দশকের গভীর ও আস্থার সম্পর্কেরই প্রতিফলন। ১৯৭৫ সালে ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘আর্যভট্ট’ থেকে শুরু করে ১৯৮৪ সালে রাকেশ শর্মার মহাকাশ ভ্রমণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাশিয়ার অবদান অবিস্মরণীয়। এমনকি ভারতের প্রথম মানববাহী মহাকাশ মিশন ‘গগনযান’-এর জন্য মহাকাশচারীদের প্রশিক্ষণ এবং জটিল ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তিতেও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই নতুন প্রজেক্টের মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে চলেছে।
এক ঝলকে
- লক্ষ্য: ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতের নিজস্ব মহাকাশ স্টেশন (BAS) নির্মাণ।
- অবস্থান: পৃথিবী থেকে ৪৫০ কিলোমিটার উচ্চতায়, ৫১.৬ ডিগ্রি ইনক্লিনেশনে।
- মূল অংশীদার: কারিগরি সহায়তায় রাশিয়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাছে ইসরো।
- সহযোগিতার মূল ক্ষেত্র: লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, ডকিং সিস্টেম এবং কন্ট্রোল প্রযুক্তি।
- প্রেক্ষাপট: ২০৩০-৩১ সালে বর্তমান আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন অবসরে যাওয়ার পর ভারতের এই স্টেশন বৈশ্বিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
