৮০ বছর বয়সেও ১৬ বছরের কম বয়সী! গড় আয়ু ১৫০ বছর, জানুন এই গোপন দীর্ঘায়ুর পেছনের মূল রহস্য – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
আধুনিক সভ্যতায় যখন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি মানুষের গড় আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে, তখন পাকিস্তানের এক দুর্গম উপত্যকায় বাস করছে বিশ্বের সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান এক জনগোষ্ঠী। উত্তর পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান প্রদেশের কারাকোরাম পর্বতমালায় ঘেরা হুনজা উপত্যকার বাসিন্দারা স্বাভাবিকভাবেই ১৪০ থেকে ১৫০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকেন। এমনকি এই জনগোষ্ঠীর নারীরা ৬০ থেকে ৬৫ বছর বয়সেও সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
দীর্ঘায়ুর নেপথ্যে প্রাকৃতিক জীবনযাত্রা
হুনজা উপজাতির এই অতিমানবিক স্বাস্থ্যের পেছনে কোনো জাদুকরী ওষুধ নেই, বরং রয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও কঠোর জীবনযাত্রা। গবেষকদের মতে, তাদের এই অবিশ্বাস্য দীর্ঘায়ুর প্রধান তিনটি স্তম্ভ রয়েছে:
- ভেজালমুক্ত খাদ্যভ্যাস: তারা বাজারজাত বা প্রক্রিয়াজাত খাবার স্পর্শ করেন না। তাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকে নিজেদের বাগানে উৎপাদিত অ্যাপ্রিকট (খুবানি), আখরোট, বিভিন্ন গোটা শস্য এবং কাঁচা শাকসবজি।
- হিমবাহের বিশুদ্ধ জল: কারাকোরাম পর্বতমালা থেকে গলে আসা খনিজ সমৃদ্ধ হিমবাহের জল তারা সরাসরি পান করেন। এই জলে থাকা প্রাকৃতিক মিনারেলস তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
- শারীরিক সক্রিয়তা: পাহাড়ি ভূখণ্ডে বসবাসের কারণে হুনজাদের যাতায়াতের একমাত্র পথ হলো হাঁটা। মাইলের পর মাইল পাহাড় চড়াই-উতরাই পার করা তাদের শরীরের মেদ জমতে দেয় না এবং হৃদযন্ত্রকে শক্তিশালী রাখে।
ক্যান্সারমুক্ত সমাজের রহস্য ও এপ্রিকট বীজ
বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারের প্রকোপ বাড়লেও হুনজা উপজাতিতে এখন পর্যন্ত কোনো ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হয়নি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো তাদের প্রচুর পরিমাণে এপ্রিকট বা খুবানি ফল খাওয়ার অভ্যাস। বিশেষ করে এই ফলের বীজে থাকা ভিটামিন বি১৭ (অ্যামিগডালিন) ক্যান্সার কোষ প্রতিরোধে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া তারা বছরে নির্দিষ্ট দুই থেকে তিন মাস কোনো কঠিন খাবার না খেয়ে কেবল ফলের রস পান করে থাকেন, যা তাদের শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে।
আব্দুল মুফাদের সেই বিস্ময়কর ঘটনা
হুনজাদের দীর্ঘায়ু নিয়ে বিশ্বব্যাপী শোরগোল শুরু হয় ১৯৮৪ সালে। আব্দুল মুফাদ নামে এক ব্যক্তি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর তার পাসপোর্ট দেখে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের চোখ কপালে ওঠে। নথিপত্র অনুযায়ী তার জন্ম সাল ছিল ১৮৩২, অর্থাৎ তখন তার বয়স ছিল ১৫২ বছর। শুরুতে এটিকে দাপ্তরিক ভুল মনে করা হলেও পরে তদন্তে জানা যায় তিনি হুনজা উপজাতির মানুষ এবং তার শারীরিক সক্ষমতা দেখে চিকিৎসকরাও হতবাক হয়ে যান।
আধুনিক প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
হুনজা জনগোষ্ঠীর জীবনধারা প্রমাণ করে যে, সুস্থ থাকার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির চেয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্য বেশি কার্যকর। ভেজালহীন খাবার গ্রহণ, নিয়মিত উপবাসের মাধ্যমে শরীরকে পরিশোধন করা এবং কায়িক পরিশ্রমই হতে পারে দীর্ঘ জীবনের চাবিকাঠি।
এক ঝলকে হুনজা উপজাতি
- গড় আয়ু: ১২০ থেকে ১৫০ বছর।
- অবস্থান: পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান প্রদেশের হুনজা উপত্যকা।
- প্রধান খাদ্য: এপ্রিকট, আখরোট, কাঁচা সবজি ও হিমবাহের জল।
- বিশেষত্ব: এখন পর্যন্ত কোনো ক্যান্সারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
- শারীরিক ক্ষমতা: নারীরা ৬০-৬৫ বছর বয়সেও মাতৃত্বের ক্ষমতা রাখেন।
- জীবনদর্শন: বছরে ২-৩ মাস উপবাস এবং কঠোর কায়িক পরিশ্রম।
