এক একর জমিতে ৯০ জনের সংসার, অভাবের মাঝেও অদম্য বেঁচে থাকার গল্প!

যৌথ পরিবার প্রথা যখন আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততায় কার্যত বিলুপ্তির পথে, তখন হরিয়ানার ফরিদাবাদের পালবলি গ্রামের ভরদ্বাজ পরিবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভাঙনের এই যুগে চার প্রজন্মের ৯০ জন সদস্যের একই ছাদের নিচে বসবাস শুধু বিস্ময়করই নয়, এটি সামাজিক সংহতির এক জীবন্ত দলিল।
ঐক্যের মূল ভিত্তি: প্রবীণের আদর্শ ও নেতৃত্ব
এই বিশাল পরিবারের বটবৃক্ষ হলেন ৯৩ বছর বয়সী ছজ্জুরাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নিজের আদর্শে তিনি পরিবারের সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন। তাঁর কাছে ক্ষমতার চেয়ে পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সন্তানদের সুশিক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একসময় ব্লক সমিতির চেয়ারম্যান হওয়ার প্রস্তাব পেলেও, পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সেই রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাঁর আপসহীন নেতৃত্বই আজ ৯০ জনের এই বিশাল পরিবারকে সংঘাতমুক্ত রাখতে সাহায্য করেছে।
যৌথ ব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা ও গণতন্ত্র
এত বড় একটি পরিবারের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো কোনো সাধারণ কাজ নয়। বিশাল এই সংসারে খাদ্য ও রসদ জোগানের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুসংগঠিত। প্রতিদিন ১০টি উনুনে চলে রান্নার কর্মযজ্ঞ। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই তারা এই বিশাল দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবারের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য মেটাতে তারা এক দারুণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করেন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সদস্যরা আলোচনা করেন এবং প্রয়োজনে ভোটাভুটির মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। এটি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সদস্যদের মানবিক মূল্যবোধের এক চমৎকার বহিঃপ্রকাশ।
বৈচিত্র্যময় পেশা ও সম্মিলিত সাফল্য
ভরদ্বাজ পরিবারের সদস্যদের সফলতার চাবিকাঠি হলো তাদের পেশাগত বৈচিত্র্য। কেবল কৃষিনির্ভর হয়ে না থেকে তারা নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছেন। পরিবারের মেয়ে রজনি ভরদ্বাজ আইএএস অফিসার হিসেবে গুরগাঁওয়ের ট্যাক্সেশন বিভাগে কর্মরত। আবার দীপক ও প্রশান্ত ভরদ্বাজ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। এছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্য কৃষি ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সম্মিলিত আয়ের মাধ্যমে তারা নিজেদের সংস্থান করছেন, যা পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভোটের সমীকরণ
যেকোনো নির্বাচনের সময় হরিয়ানার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ভরদ্বাজ পরিবার এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ৯০ জন সদস্যের একটি সুসংহত পরিবার যেকোনো প্রার্থীর জয়ের ক্ষেত্রে একটি শক্ত ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে কাজ করে। স্থানীয়দের মতে, নির্বাচনকালে এই পরিবারটি যে প্রার্থীকে সমর্থন করে, তাঁর বিজয়ের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই প্রভাবের কারণেই ভোটের মরসুমে এই বাড়ির দরজায় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত আনাগোনা লেগেই থাকে।
এক ঝলকে
- পরিবার: ফরিদাবাদের পালবলি গ্রামের ভরদ্বাজ পরিবার।
- সদস্য সংখ্যা: চার প্রজন্মের মোট ৯০ জন সদস্য।
- নেতৃত্ব: ৯৩ বছর বয়সী অভিভাবক ছজ্জুরাম।
- রান্নাঘর: ১০টি উনুনে প্রতিদিন রান্নার কর্মযজ্ঞ চলে।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণ: আলোচনা ও প্রয়োজনে ভোটাভুটির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সমাধান।
- সাফল্য: পরিবারের সদস্যরা আইএএস অফিসার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে সফল।
- পেশা: কৃষি, ব্যবসা এবং উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরির সমন্বয়িত পেশা।
