ইসরায়েলের সঙ্গে ২০ বছরের প্রতিরক্ষা চুক্তি স্থগিত করল ইতালি, কী কারণে এই চরম সিদ্ধান্ত?

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষিতে এক বড় কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিল ইতালি। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চলে আসা ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিও মেলোনি। ২০০৬ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি নিয়মিত বিরতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হয়ে আসছিল, তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এবার তা সরাসরি বাধাগ্রস্ত হলো।

স্থগিতের নেপথ্যে ইতালির ক্ষোভ

ইতালির এই কঠোর সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছে গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ইতালীয় কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, এই স্থগিতাদেশ তারই প্রতিফলন। মূলত তিনটি কারণে ইতালি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে:

  • লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী বা ইউনিফিল (UNIFIL)-এর গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলি চালানোর ঘটনাকে ইতালি অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে দেখছে। এটি আন্তর্জাতিক সনদের পরিপন্থী বলে মনে করছে দেশটি।
  • লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণে বেসামরিক সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
  • ইতালির রাষ্ট্রদূতকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের তলব করার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করে। পরিস্থিতির উত্তরণে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি বৈরুত সফর করে লেবানন সরকারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বড় ধাক্কা

এই চুক্তি স্থগিত হওয়ার অর্থ হলো দুই দেশের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম আদান-প্রদান, কৌশলগত গবেষণা এবং উন্নত প্রযুক্তিগত বিনিময় এখন পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। দুই দশক ধরে চলে আসা সামরিক অংশীদারিত্বের সমাপ্তি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতিই নির্দেশ করে না, বরং ইসরায়েলের বর্তমান সামরিক নীতির বিরুদ্ধে ইউরোপের ক্রমবর্ধমান কঠোর অবস্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্ব অর্থনীতি ও হরমুজ প্রণালী নিয়ে শঙ্কা

প্রধানমন্ত্রী জর্জিও মেলোনি কেবল দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। উল্লেখ্য যে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল এবং সার সরবরাহের প্রধান রুট হলো এই প্রণালী। যুদ্ধের দামামা চললে এই রুট বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা ইতালিসহ পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী মেলোনি দ্রুত শান্তি আলোচনা শুরুর ওপর জোর দিয়েছেন।

এক ঝলকে

  • ঘটনা: ২০০৬ সালে স্বাক্ষরিত ইসরায়েলের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্থগিত করল ইতালি।
  • প্রধান কারণ: লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা।
  • কূটনৈতিক অবস্থান: শান্তি আলোচনার পক্ষে ইতালির দৃঢ় অবস্থান এবং লেবাননের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন।
  • অর্থনৈতিক উদ্বেগ: সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল ও সার সরবরাহে বড় ধরণের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা।
  • ভবিষ্যৎ: শান্তি আলোচনার অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত এই সামরিক সহযোগিতা পুনর্বহালের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *