বন্ধক রাখা সোনা থেকে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন: ১৯৯১-এর সেই ‘ম্যাজিক’ যেভাবে বদলে দিল ভারতের ভাগ্য! – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, আমদানির ব্যয় মেটানোর জন্য দেশের কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল মাত্র ১২০ কোটি ডলার। এই অর্থ দিয়ে বড়জোর দুই সপ্তাহের খরচ চালানো সম্ভব ছিল। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছায়। ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে বাধ্য হয়ে ভারত তার সঞ্চিত ৬৭ টন সোনা ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড এবং ইউনিয়ন ব্যাংক অফ সুইজারল্যান্ডের কাছে বন্ধক রাখে। মূলত উপসাগরীয় যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি, প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি ভারতকে এই চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
গোপন অভিযান ও জাতীয় মর্যাদাহানি
সোনা বন্ধক রাখার বিষয়টি চরম গোপনীয়তার সাথে করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালের মে মাসে যখন চার্টার্ড বিমানে করে সোনা লন্ডনে পাঠানো হচ্ছিল, তখন মাঝপথে বিমানের টায়ার পাংচার হয়ে যায়। নিরাপত্তার খাতিরে বিমানবন্দরে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হলে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। এই ঘটনাটি তৎকালীন সংসদ ও গণমাধ্যমে “জাতীয় অপমান” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছিল যে, সরকার দেশের “ঘরের গয়না” বিক্রি করে দিচ্ছে।
পিভি-মনমোহন জুটি এবং ঐতিহাসিক সংস্কার
এই সংকটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী পি.ভি. নরসিমা রাও এবং অর্থমন্ত্রী ডক্টর মনমোহন সিং যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। ১৯৯১ সালের ২৪ জুলাই বাজেট বক্তৃতায় মনমোহন সিং ভিক্টর হুগোকে উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, “পৃথিবীর কোনো শক্তিই এমন একটি ধারণাকে রুখতে পারে না, যার সময় উপস্থিত হয়েছে।” এরপরই শুরু হয় এলপিজি (LPG) মডেলের বিপ্লব। এই মডেলে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল:
- L (Liberalization বা উদারীকরণ): লাইসেন্স রাজের অবসান ঘটিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করা হয়।
- P (Privatization বা বেসরকারীকরণ): শুধুমাত্র সরকারি খাতের জন্য সংরক্ষিত ক্ষেত্রগুলো বেসরকারি কো ম্পা নির জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
- G (Globalization বা বিশ্বায়ন): আমদানি শুল্ক কমিয়ে ভারতীয় অর্থনীতিকে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করা হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হয়।
আইসিইউ থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে দাপট
তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং বিদেশি কো ম্পা নির কাছে অর্থনৈতিক দাসত্বের ভয়কে উপেক্ষা করেই এই সংস্কারগুলো কার্যকর করা হয়। এর ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। এক বছরের মধ্যেই ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১১০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ৫৬০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ভারত তার বন্ধক রাখা সোনাও ছাড়িয়ে আনে। আজ ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৬০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ১৯৯১ সালের সেই কঠিন সিদ্ধান্তগুলোই ভারতকে আজকের আধুনিক ও শক্তিশালী বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করেছে।
