সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণে বাড়ছে উত্তেজনা, বিজিবির আগ্রাসী মনোভাবের নেপথ্যে কোন সমীকরণ? – এবেলা

সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণে বাড়ছে উত্তেজনা, বিজিবির আগ্রাসী মনোভাবের নেপথ্যে কোন সমীকরণ? – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণকে কেন্দ্র করে ওপার বাংলায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) যখন দ্রুতগতিতে বেড়া নির্মাণের কাজ শেষ করতে চাইছে, তখন বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড (বিজিবি) সদস্যদের তরফ থেকে ক্রমাগত বাধা দেওয়ার চেষ্টা এবং আগ্রাসী আচরণের খবর সামনে আসছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের দোহাই দিয়ে বিজিবির এই আকস্মিক সক্রিয়তা দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় এক নতুন টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত হিসেবে পরিচিত ৪,০৯৬ কিলোমিটারের এই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরেখা পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরামের ওপর দিয়ে গেছে। ভারতের অংশে সুরক্ষার দায়িত্ব ২৪ ঘণ্টা বিএসএফের কাঁধে থাকলেও ওপারে রয়েছে বিজিবি। প্রায় ৭০,০০০ সক্রিয় সদস্য নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের এই আধাসামরিক বাহিনীর ৬৪টি ব্যাটালিয়ন সরাসরি ভারত সীমান্তে মোতায়েন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কাঁটাতার স্থাপনের কাজ চলাকালে বিজিবি জওয়ানদের পক্ষ থেকে পাথর ছোড়া, বেড়া নির্মাণে আপত্তি জানানো এবং বিএসএফ জওয়ানদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একাধিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।

বিরোধের মূল কারণ ও বিজিবির অনড় অবস্থান

বিজিবির এই আকস্মিক আগ্রাসী মনোভাবের পেছনে প্রধানত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, সীমান্ত আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সীমানার ১৫০ গজ এলাকা বা ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এর ভেতর কোনো স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণ নিষিদ্ধ। বিজিবির দাবি, ভারত নিজেদের অংশে বেড়া দিলেও তা অনেক ক্ষেত্রে এই নির্দিষ্ট সীমার লঙ্ঘন করছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আচরণে ভারতের প্রতি এক ধরনের কঠোর ও আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এছাড়া, সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় চোরাচালান, মাদক পাচার ও অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে বিএসএফ কঠোর অবস্থান নেওয়ায় স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহল ও বিজিবির একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

পাকিস্তান সীমান্তের ইতিবাচক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তেও অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে নয়াদিল্লি। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ ও মাদক পাচার রুখতে এই দীর্ঘ সীমান্তে আধুনিক সেন্সর ও ক্যামেরা সম্বলিত ‘স্মার্ট বেড়া’ স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

সম্ভাব্য প্রভাব ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ

সীমান্তের এই চলমান উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা স্থানীয় স্তরে ছোটখাটো সামরিক সংঘাত বা ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দিতে পারে, যা সীমান্ত সংলগ্ন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে। যদিও বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় বরাবরই সচেষ্ট। অতীতেও এই ধরনের মতপার্থক্য দূর করতে দুই বাহিনীর ডিজি-পর্যায়ে শত শত ফ্ল্যাগ মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। সীমান্ত অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে উসকানিমূলক আচরণ বন্ধ করে অনতিবিলম্বে আলোচনার টেবিলে বসা এবং যৌথ সীমান্ত সমীক্ষার মাধ্যমে আইনি জটিলতার অবসান ঘটানোই একমাত্র কার্যকর পথ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *