তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেফতার স্বরূপ বিশ্বাস, টলিপাড়ায় পরিবর্তনের হাওয়া, স্বস্তি নাকি ক্ষোভের বিস্ফোরণ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই তথা টলিউডের প্রভাবশালী সংগঠন ‘ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’র প্রাক্তন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারির পর উত্তাল টালিগঞ্জ। বৃহস্পতিবার রাতে তোলাবাজি এবং শ্লীলতাহানির গুরুতর অভিযোগে নিউ আলিপুর থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘ দিন ধরে টলিপাড়ার একাংশের ওপর চলা একাধিপত্য এবং ভয়ের পরিবেশের অবসানের ইঙ্গিত হিসেবে এই ঘটনাকে দেখছেন সিনেমা জগতের অনেকেই। তবে এই গ্রেফতারি ঘিরেই এখন টলিউডের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও চুলচেরা বিশ্লেষণ।
একচ্ছত্র দাপট এবং টলিপাড়ায় ক্ষোভের আবহ
তৃণমূল জমানায় টলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে স্বরূপ বিশ্বাসের দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। ছবি মুক্তি, শুটিংয়ের অনুমতি কিংবা কলাকুশলী নিয়োগ— প্রতি ক্ষেত্রেই তাঁর সিদ্ধান্তই শেষ কথা বলে গণ্য হতো। অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে শুটিং বন্ধ করে দেওয়া, নিয়মের নামে প্রযোজকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং ভিন্নমতাবলম্বী শিল্পীদের অঘোষিতভাবে কাজ থেকে বয়কট বা ‘ব্যান’ করার মতো ঘটনা ঘটেছে তাঁরই নির্দেশে। সুদেষ্ণা রায়, ঋদ্ধি সেন ও অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মতো প্রথম সারির পরিচালক ও শিল্পীদের অতীতে এই ক্ষমতার কোপে পড়তে হয়েছিল। স্বরূপের এই গ্রেফতারিকে পরিবেশক শতদীপ সাহা সহ অনেকেই দীর্ঘদিনের দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে ‘স্বস্তির খবর’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ব্যবস্থার গভীরে পচন, একা স্বরূপের পতনে কী বদলাবে সিস্টেম
স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারি টলিপাড়ায় স্বস্তি আনলেও, ইন্ডাস্ট্রির সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত বড় অংশ। অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রের মতে, শুধু একজন বা দুজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না, কারণ গোটা সিস্টেমটাই পচে গিয়েছে। মানুষের মেরুদণ্ড এবং সততা না ফিরলে কেবল নাম বদলাবে, পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না। অন্যদিকে সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ও বিদীপ্তা চক্রবর্তীর মতো ব্যক্তিত্বদের স্পষ্ট দাবি, স্বরূপ বিশ্বাস আসলে হিমশৈলের চূড়ামাত্র। টলিউডকে কেন্দ্র করে যে প্রভাবশালী চক্র বা ‘নেক্সাস’ গড়ে উঠেছে, তার শিকড় অনেক গভীরে। শুধু একজনের পতনে আনন্দিত না হয়ে, এই দুর্নীতির পেছনে থাকা অন্য মাথাদেরও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
অরাজনৈতিক টলিউডের প্রত্যাশা ও আগামীর প্রভাব
বিগত কয়েক বছরে টলিউড এবং রাজনীতি যেভাবে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল, এই ঘটনার পর তা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছেন কলাকুশলীরা। ভরত কল, অরিন্দম শীল এবং শ্বেতা ভট্টাচার্যের মতো অভিনয় জগতের ব্যক্তিত্বরা মনে করছেন, অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্যের পতন অবশম্ভাবী ছিল। এই ঘটনা আগামী দিনে ফেডারেশনের দায়িত্বে আসতে চলা নতুন নেতৃত্বের জন্য বড় শিক্ষা। এর ফলে টলিপাড়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমবে এবং সিনেমা শিল্প আবার মুক্ত ও অরাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে। শুক্রবারই ধৃত স্বরূপ বিশ্বাসকে আদালতে পেশ করেছে পুলিশ এবং এই তদন্তের অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করছে টলিউডের আগামীর ক্ষমতার সমীকরণ।
