‘বুলডোজার সংস্কৃতি বাংলায় চলবে না!’ পুর-দ্বন্দ্বে বিজেপিকে তুলোধোনা করে কর্মীদের ‘ভোকাল টনিক’ মমতার – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ
দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে মমতার ‘ভোকাল টনিক’, চাপ নিয়ে কাউন্সিলরদের সতর্ক করলেন তৃণমূলনেত্রী
কলকাতা পৌরসভার (KMC) মাসিক অধিবেশন কক্ষে তালা ঝুলিয়ে ‘গায়ের জোরে’ সভা বাতিল করার অভিযোগে বিজেপির বিরুদ্ধে রণং দেহি মূর্তি ধারণ করল তৃণমূল কংগ্রেস। শুক্রবার সকালে পুরভবনে ঘটে যাওয়া এই বেনজির কাণ্ড নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন খোদ তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় কাউন্সিলরদের নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠকে তিনি স্পষ্ট জানান, বিজেপির এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি কলকাতার সমস্ত কাউন্সিলরদের রাজপথে নেমে জোরদার আন্দোলনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
অধিবেশন কক্ষে তালা, ক্লাব ঘরে বিকল্প বৈঠক
শুক্রবার সকালে কলকাতা পৌরসভায় নির্ধারিত মাসিক অধিবেশন ছিল। কিন্তু পুরভবনে পৌঁছে শাসকদলের কাউন্সিলররা দেখেন মূল সভাকক্ষের দরজায় মস্ত বড় তালা ঝুলছে। এই দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান জনপ্রতিনিধিরা। শেষ পর্যন্ত ভেতরে ঢুকতে না পেরে পৌরসভারই একটি অন্য ঘরে (ক্লাব ঘরে) বিকল্প বৈঠক করতে বাধ্য হন তাঁরা। চেয়ারপার্সন মালা রায় এবং মেয়র ফিরহাদ হাকিমের উপস্থিতিতেই চলে সেই বিকল্প সভা।
তৃণমূল সূত্রে খবর, কলকাতার ১৩৭ জন কাউন্সিলরের মধ্যে প্রায় ১১০ জন এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। কাউন্সিলররা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে আচমকা কর্পোরেশনের কন্ট্রোল রুমের ফোন নম্বর থেকে অধিবেশন বাতিলের খবর দিয়ে তাঁদের কাছে ফোন আসে এবং বাড়িতে চিঠি পাঠানো হয়। অথচ, এই বিষয়ে মেয়র ফিরহাদ হাকিম বা চেয়ারপার্সন মালা রায়ের কোনো সম্মতিই ছিল না।
ডোরিনা ক্রসিংয়ে বিক্ষোভ ও ধরনার নির্দেশ
এই খবর পেয়েই ক্ষোভে ফেটে পড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি অবিলম্বে মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে নির্দেশ দেন সকলকে একজোট করে ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিং বা তার আশেপাশের এলাকায় বড়সড় প্রতিবাদ কর্মসূচি সংগঠিত করতে। দলনেত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “কলকাতা কর্পোরেশনের বাইরে ধরনা-বিক্ষোভ করতে যদি বাধা দেওয়া হয়, তবে পুরসদনের ভেতরেই বিক্ষোভ দেখাবেন তৃণমূল কাউন্সিলররা।” বৈঠকে উপস্থিত থেকে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও সুর চড়িয়ে বলেন, “লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।” শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে, কোনো পরিস্থিতিতেই কেউ পদত্যাগ করবেন না। কারও বিরুদ্ধে যদি প্রতিহিংসামূলক মামলা করা হয়, তবে দল সম্পূর্ণভাবে আইনি লড়াইয়ে পাশে থাকবে।
বাংলায় ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ চলবে না
এদিনের বৈঠক থেকে শহরের সাম্প্রতিক ‘বাড়ি ভাঙা’ এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির অংশ ভাঙার নোটিস প্রসঙ্গে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ শানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরপ্রদেশ বা ভিন রাজ্যের ধাঁচে বাংলায় ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না স্পষ্ট করে তিনি বলেন:
“এভাবে শুধু একটা নোটিশ দিয়েই কারও বাড়ি ভেঙে দেওয়া যায় না। তার একটা নির্দিষ্ট আইনি পদ্ধতি আছে, পৌরসভার নিজস্ব নিয়মকানুন আছে। তার জন্য প্রথমে হেয়ারিং (শুনানি) করতে হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য মন দিয়ে শুনতে হয়, আইনি পরামর্শ নিতে হয় এবং তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তা না করে নোটিশ দিয়েই বুলডোজার নিয়ে বাড়ি ভাঙতে চলে এলাম— এ জিনিস কোথাও হয় না, করাও যায় না। এখানে স্রেফ গা জোয়ারি কাজ চালানো হচ্ছে।”
সাংগঠনিক রদবদল
এই হাইভোল্টেজ বৈঠকেই পৌরসভার অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক রদবদল নিয়েও কড়া পদক্ষেপ নিয়েছেন নেত্রী। কলকাতা পৌরসভার ৯ নম্বর বরোর চেয়ারপারসন দেবলীনা বিশ্বাসের পদত্যাগের পর, আগামী সাতদিনের মধ্যে সেই শূন্যপদে নতুন কোনো যোগ্য মুখ বেছে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সব মিলিয়ে, পৌরসভার অধিবেশন কক্ষে তালা ঝোলানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলকাতার রাজনৈতিক পারদ এক ধাক্কায় অনেকটাই চড়ে গেল।
এক ঝলকে
- কলকাতা পৌরসভার অধিবেশন কক্ষে তালা ঝোলানোর প্রতিবাদে বিজেপির বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনের ডাক দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
- শুক্রবার মূল কক্ষে ঢুকতে না পেরে চেয়ারপার্সন ও মেয়রের উপস্থিতিতে বিকল্প ঘরে সভা করেন প্রায় ১১০ জন তৃণমূল কাউন্সিলর।
- মেয়র ফিরহাদ হাকিমের নেতৃত্বে ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিংয়ে জোরদার বিক্ষোভ কর্মসূচি করার নির্দেশ দলনেত্রীর।
- আইনি প্রক্রিয়া না মেনে নোটিস দিয়েই বাড়ি ভাঙার তীব্র বিরোধিতা করে বাংলায় ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে সরব হলেন মমতা।
- আগামী ৭ দিনের মধ্যে কলকাতা পৌরসভার ৯ নম্বর বরোর নতুন চেয়ারপারসন নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
