বোধন শুধুই আচার নয়, অশুভ বিনাশে অন্তরের জাগরণ: জানুন মহাষষ্ঠীর আসল পৌরাণিক ও শাস্ত্রীয় অর্থ – এবেলা

বোধন শুধুই আচার নয়, অশুভ বিনাশে অন্তরের জাগরণ: জানুন মহাষষ্ঠীর আসল পৌরাণিক ও শাস্ত্রীয় অর্থ – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

আজ মহাষষ্ঠী। বাঙালির শারদীয়া দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের দিন। ষষ্ঠীর দিনে দেবী দুর্গার বোধনের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় দুর্গাপুজোর মূল আচার-অনুষ্ঠান। কিন্তু নবরাত্রি তো ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে, তাহলে আবার দেবীর বোধন করার প্রয়োজন কেন? এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীন পুরাণ, গভীর শাস্ত্র এবং সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসের এক বিশেষ তাৎপর্য।

মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন কেন করা হয়?

শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুসারে, দক্ষিণায়ণের সময় দেবতারা নিদ্রিত থাকেন। শরৎকাল দক্ষিণায়ণের অন্তর্গত হওয়ায় এই সময় দেবী দুর্গার আরাধনা শুরুর আগে তাঁকে জাগ্রত করার এক বিশেষ রীতি প্রচলিত রয়েছে। দেবীকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাগিয়ে তোলার এই পবিত্র প্রক্রিয়াকেই বলা হয় ‘বোধন’।

শরৎকালের এই দুর্গাপুজোকে তাই ‘অকালবোধন’ও বলা হয়। প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, লঙ্কা জয়ের উদ্দেশ্যে ও রাবণের বিরুদ্ধে জয়লাভের আশায় ভগবান রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। দেবীর প্রচলিত পূজার সময়ের বাইরে এই অকাল আরাধনা করা হয়েছিল বলেই তা ‘অকালবোধন’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

মহাষষ্ঠীর দিনে মূলত বেলগাছে বা বিল্বশাখায় দেবীর বোধন সম্পন্ন করা হয়। এরপর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মতো নানাবিধ ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। এই আচারগুলির মাধ্যমেই দুর্গাপুজোর মূল উৎসব পর্বের সূচনা ঘটে।

মহাষষ্ঠীতে দেবী কাত্যায়নীর আরাধনা

নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে দেবী দুর্গার ষষ্ঠ রূপ মা কাত্যায়নীর পুজো করা হয়। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহর্ষি কাত্যায়নীর কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী তাঁর ঘরে কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই থেকেই তিনি দেবী কাত্যায়নী নামে পরিচিত হন।

ধর্মীয় গ্রন্থে দেবী কাত্যায়নীর বিভিন্ন রূপের অপূর্ব বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁকে কখনও চতুর্ভুজা, আবার কখনও দশভুজা বা অষ্টাদশভুজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তাঁর দুই হাতে থাকে পদ্ম ও খড়্গের মতো অস্ত্র। সিংহবাহিনী এই দেবী সর্বভূতে অসুরবিনাশিনী হিসেবেও পরিচিত। মহিষাসুর বধের পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গেও তাঁর গভীর যোগ রয়েছে।

ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, দেবী কাত্যায়নীর আরাধনা করলে মনের সব বাঞ্ছা পূরণ হয় এবং জীবনের সমস্ত বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিক শক্তি লাভ করা যায়।

কৃষ্ণলাভের আশায় কাত্যায়নীর পুজো করেছিলেন গোপিনীরা

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত পুরাণকথাতেও দেবী কাত্যায়নীর বিশেষ মহিমার উল্লেখ রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, বৃন্দাবনের গোপিনীরা কার্তিক মাসে দেবী কাত্যায়নীর পুজো করেছিলেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরম আরাধ্য শ্রীকৃষ্ণকে স্বামী হিসেবে লাভ করা।

কথিত আছে, গোপিনীরা ভোরে যমুনায় স্নান করে দেবীর মাটির প্রতিমা তৈরি করতেন এবং ফুল, ধূপ, প্রদীপ ও চাল নিবেদন করে প্রার্থনা জানাতেন। তাঁদের আরাধনার সঙ্গে যুক্ত সেই বিখ্যাত মন্ত্রটি হল—

‘কাত্যায়নী মহামায়ে মহাযোগিন্যধীশ্বরী। নন্দগোপসুতং দেবি পতিং মে কুরু তে নমঃ।’

এই পবিত্র মন্ত্রের মাধ্যমেই তাঁরা শ্রীকৃষ্ণকে পতি হিসেবে পাওয়ার আকুল প্রার্থনা জানিয়েছিলেন।

তন্ত্রশাস্ত্রে দেবী কাত্যায়নীর গুরুত্ব

তন্ত্রশাস্ত্রের বিভিন্ন ধারায় দেবী কাত্যায়নীকে আজ্ঞাচক্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই চক্রটি মানুষের দুই ভ্রুর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত বলে যোগশাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে। আধ্যাত্মিক সাধনায় আজ্ঞাচক্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, এই চক্রের সাধনা মানুষের মনোসংযোগ বৃদ্ধি করে, আত্মোপলব্ধি ঘটায় এবং মানসিক দৃঢ়তা অর্জনে সাহায্য করে।

বোধন শুধুই আচার নয়, এক চেতনার জাগরণ

মহাষষ্ঠীতে দেবীর বোধন বাঙালির দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় পর্ব। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে দেবীকে আহ্বান জানানোর প্রাচীন প্রথা, মনোমুগ্ধকর পৌরাণিক কাহিনি এবং গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস।

ভক্তদের কাছে বোধন শুধুমাত্র একটি প্রথাগত আচার নয়, বরং এটি অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভশক্তির চিরন্তন জাগরণের প্রতীক। দেবী দুর্গার আরাধনার মাধ্যমে তাঁরা জীবনের সমস্ত অন্ধকার দূর হওয়া, পরিবারের মঙ্গল, মনের ইচ্ছা পূরণ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রার্থনা করেন।

তাই মহাষষ্ঠীর এই বোধনের মধ্য দিয়েই বাঙালির দুর্গোৎসব পায় এক অনন্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *