চীনের ‘সস্তা ইস্পাত’ কি বিশ্ব বাজারে বড় ধস নামাবে?

চীনের ‘সস্তা ইস্পাত’ কি বিশ্ব বাজারে বড় ধস নামাবে?

বিশ্ববাজারে আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ: চীনা ইস্পাতের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করল ইউরোপীয় ইউনিয়ন

বিশ্ববাজারে দাপট বজায় রাখা চীনের শিল্পনীতির লাগাম টানতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকরা সর্বসম্মতভাবে সস্তা চীনা ইস্পাত আমদানির ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বেইজিংয়ের জন্য কৌশলগতভাবে একে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। ইউরোপীয় বাজারের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য।

ইউরোপীয় ইস্পাত শিল্পের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা

ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইস্পাত শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে চীনা ইস্পাতের সস্তা জোগান ইউরোপীয় স্থানীয় উৎপাদনকারীদের কোণঠাসা করে রেখেছিল। ইইউ-র বাণিজ্য প্রধান মারোস শেফকোভিচ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বৈশ্বিক বাজারে উৎপাদন ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতাকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা ইউরোপীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এবং শিল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

চুক্তির মূল বিষয়সমূহ

ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আমদানিকৃত ইস্পাতের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। এর প্রধান দিকগুলো হলো:

  • শুল্কমুক্ত আমদানির বার্ষিক কোটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ১৮.৩ মিলিয়ন টনে নামিয়ে আনা হয়েছে।
  • ২০১৩ সালকে ভিত্তি বছর হিসেবে বিবেচনা করে এই নতুন নীতিমালা কার্যকর করা হচ্ছে, কারণ এখান থেকেই বাজারের ভারসাম্যহীনতা প্রকট হয়েছিল।
  • ২৫ শতাংশের পরিবর্তে এখন আমদানির ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর হতে পারে।
  • এই নতুন নিয়ম আইসল্যান্ড, লিশটেনস্টাইন এবং নরওয়ে ব্যতীত বিশ্বের বাকি সব দেশের ইস্পাত আমদানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

চীনা ভর্তুকি বনাম ইউরোপীয় সংকট

চীন বর্তমানে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি ইস্পাত এককভাবে উৎপাদন করে। অভিযোগ রয়েছে, চীনা সরকার স্থানীয় উৎপাদকদের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে থাকে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তারা অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে ইস্পাত রপ্তানি করতে সমর্থ হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে। গত বছর ইউরোপে ইস্পাত উৎপাদন কমে ১২৬ মিলিয়ন টনে নেমে আসে, যা এক ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন সীমা। অন্যদিকে, চীনের উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৯৬০ মিলিয়ন টনে। মার্কিন শুল্ক নীতি এবং জ্বালানি সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ ইতোমধ্যে ইউরোপীয় শিল্পকে চাপে ফেলেছে, যেখানে নতুন এই শুল্ক আরোপ পরিস্থিতির সামঞ্জস্য ফেরানোর একটি প্রয়াস মাত্র।

অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানগত প্রভাব

ইউরোপীয় ইস্পাত শিল্প গোষ্ঠী ‘ইউরোফার’ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপীয় অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। এই পদক্ষেপের ফলে ইস্পাত খাতের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। যদিও জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান, তবে এই কঠোর শুল্ক নীতি শিল্পটিকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এক ঝলকে

  • বিদেশি ইস্পাতের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্ক বেড়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে।
  • শুল্কমুক্ত আমদানির পরিমাণ ৪৭ শতাংশ কমিয়ে আনা হয়েছে।
  • এই উদ্যোগের ফলে ইউরোপে প্রায় ২.৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে।
  • নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শুল্কমুক্ত আমদানির বার্ষিক সর্বোচ্চ সীমা ১৮.৩ মিলিয়ন টন।
  • অতিরিক্ত উৎপাদন ও সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে বাজার অস্থিতিশীল করার দায়ে চীনকে মূলত দায়ী করা হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *