জন্মলগ্ন থেকেই কেন বারবার বিতর্কে নিট, প্রশ্নফাঁস থেকে আত্মহত্যায় জেরবার দেশের শিক্ষামহল – এবেলা

জন্মলগ্ন থেকেই কেন বারবার বিতর্কে নিট, প্রশ্নফাঁস থেকে আত্মহত্যায় জেরবার দেশের শিক্ষামহল – এবেলা

এবেলা ডেস্কঃ

সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা তথা ‘নিট’ (NEET) নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ২০২৩ সালের শুরু থেকে আজ ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই পরীক্ষা ঘিরে একের পর এক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। সম্প্রতি গত ৩ মে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) আয়োজিত নিট ইউজি পরীক্ষা ঘিরে নতুন করে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। প্রায় ২৩ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে পরীক্ষার অন্তত একমাস আগে সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে রসায়নের ১২০টি প্রশ্ন আসল পরীক্ষার সঙ্গে হুবহু মিলে গিয়েছে। ঘটনার তদন্তভার এখন সিবিআইয়ের হাতে এবং পুণের এক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপককে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই নজিরবিহীন দুর্নীতির জেরে সরকার এখন অনলাইন পরীক্ষার পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেও ক্ষোভ কমেনি।

আইনি বাধা ও রাজ্যগুলির ক্ষোভ

নিটের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৩ সালে এই পরীক্ষা চালুর সময় থেকেই রাজ্যগুলির অধিকারে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিল একাধিক রাজ্য সরকার। বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায় এবং প্রাথমিকভাবে আদালত এটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলেও পরে সেই রায় বাতিল হয়। এরপর ২০১৫ সালে অভিনব ব্লুটুথ জালিয়াতির কারণে সুপ্রিম কোর্ট গোটা পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। ২০১৬ সালেও দ্বিতীয় পর্বের পরীক্ষা ঘিরে প্রশ্নফাঁসের জোরালো অভিযোগ উঠেছিল।

আঞ্চলিক বৈষম্য, আত্মহত্যা ও সলভার গ্যাংয়ের দাপট

২০১৭ সালে নিট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক বৈষম্যের বিতর্ক চরম আকার ধারণ করে। অভিযোগ ওঠে, হিন্দিভাষী পরীক্ষার্থীদের তুলনায় আঞ্চলিক ভাষার প্রশ্নপত্র অনেক কঠিন করা হয়েছিল। এই বৈষম্যের জেরে তামিলনাড়ুর এক মেধাবী পড়ুয়ার আত্মহত্যার ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তীকালে দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে একটি বড় নির্বাচনী ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এরপর ২০২০ ও ২০২১ সালে প্রশ্নফাঁসের ধরন বদলে যায় এবং আসরে নামে ‘সলভার গ্যাং’। অর্থের বিনিময়ে আসল পরীক্ষার্থীর বদলে ভুয়ো পরীক্ষার্থী বসিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানোর চক্র গড়ে ওঠে। ২০২৪ সালেও বিহারের হাজারিবাগে প্রশ্নপত্র চুরি এবং অস্বাভাবিক নম্বরের বিতর্ক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয় এনটিএ-কে।

ভবিষ্যৎ প্রভাব ও প্রশাসনের ভূমিকা

চলতি ২০২৬ সালেও প্রশ্নফাঁসের ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় দেশজুড়ে প্রায় ২৩ লক্ষ পরীক্ষার্থী চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এবং তাঁদের পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে। এবিভিপি-সহ দেশের সমস্ত প্রধান ছাত্র সংগঠন এই অব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে। বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি এবং পড়ুয়াদের আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থার বিশ্বস্ততা ও নিরপেক্ষতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার ফলে একদিকে যেমন যোগ্য চিকিৎসকদের উঠে আসার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যে মানসিক চাপ ও ক্ষোভ ক্রমাগত বাড়ছে। তা সত্ত্বেও শীর্ষ আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি নীরবতা বিতর্ককে আরও উস্কে দিচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *